সিলেট ব্যুরো
- শহরে অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ
- উদাসীন পরিবেশ অধিদফতর
সিলেটে চলছে পাহাড় ও টিলা কাটার মহোৎসব। গত দেড় দশকে সিলেট থেকে সাবাড় হয়ে গেছে প্রায় এক হাজার ৫০০ পাহাড় ও টিলা। এতে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি দুর্ঘটনাও বাড়ছে। গত এক যুগে সিলেটে টিলাধসে ৬২ জন নিহত হয়েছেন। তবুও টনক নড়ছে না পরিবেশ অধিদফতরের।
পরিবেশবিদরা বলছেন, পাহাড় টিলা কাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদফতর ও প্রশাসনকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ‘পাহাড় ও চায়ের দেশ’ হিসেবে পরিচিত সিলেট কেবলই এক কংক্রিটের জঞ্জালে পরিণত হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ভূ-প্রকৃতি এবং ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক হচ্ছে সবুজ পাহাড় ও টিলা। গত দেড় দশকে অপরিকল্পিত নগরায়ন, আবাসন প্রকল্প এবং অবৈধভাবে মাটি ও বালুখেকোদের আগ্রাসনে সিলেটের মানচিত্র থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে এই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। অপরিকল্পিত পাহাড় কাটার কারণে অবর্ণনীয় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পুরো জেলার পরিবেশ।
পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী তথ্য বলছে, ২০০৯ সালে সিলেট জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট এক হাজার ২৫টি পাহাড় ও টিলার অস্তিত্ব রেকর্ড করা হয়েছিল; কিন্তু সরকারি নজরদারির অভাব এবং প্রভাবশালীদের সিন্ডিকেটের কারণে ২০২৪ সালের মধ্যে এই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র ৫৬৫টিতে এসে দাঁড়ায়। ২০২৫ ও ২০২৬ সাল জুড়ে অব্যাহতভাবে পাহাড় কাটার কারণে বর্তমানে পুরো জেলায় প্রকৃত পাহাড়-টিলার সংখ্যা ৫০০-এর নিচে নেমে এসেছে।
পুরো জেলার সুনির্দিষ্ট হালনাগাদ সরকারি পরিসংখ্যান না থাকলেও, ২০২৫ সালের কিছু আঞ্চলিক প্রতিবেদনে সিলেট জেলার নির্দিষ্ট কিছু এলাকার এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাহাড়খেকো চক্র মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কৌশলে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। রাতের আঁধারে স্কেভেটর দিয়ে কাটা হয় পাহাড়।
সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সিলেট নগরীর হাওলাদারপাড়া, আখালিয়া, পীরমহল্লা, ব্রাহ্মণশাসন, জাহাঙ্গীরনগর, তারাপুর চা বাগান এবং বালুচর, বিমানবন্দর সড়ক, খাদিমপাড়া, খাদিমনগর, জোনাকী, ইসলামপুর মেজরটিলা ও মোগলিপাড়া এলাকার বিভিন্ন পাহাড়-টিলার পাদদেশে কয়েক শত পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন। এ ছাড়া জৈন্তাপুর, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পাহাড় ও টিলার পাদদেশে হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর সিলেট শাখার সদস্যসচিব আবদুল করিম চৌধুরী কিম দাবি করেন, গত তিন দশকে সিলেট নগরে প্রায় ৭০ শতাংশ টিলা ও পাহাড় ধ্বংস করা হয়েছে। আর জেলায় ৬০ শতাংশ পাহাড় ধ্বংস করা হয়েছে। আবদুল করিম কিম বলেন, পাহাড় ও টিলাগুলো সিলেটের ভূপ্রকৃতিতে ‘প্রাকৃতিক স্পঞ্জ’ হিসেবে কাজ করে, যা অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধরে রাখে; কিন্তু এই টিলাগুলো বিলীন হয়ে যাওয়ার কারণে বৃষ্টির পানি সরাসরি সমতলে চলে আসছে। ফলে সিলেটে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃত্রিম বন্যা ও দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ও পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-র স্থানীয় প্রতিনিধিদের মতে, সরকারিভাবে পাহাড়-টিলার সুনির্দিষ্ট ও নিয়মিত হালনাগাদ সংখ্যা প্রকাশ না করা অত্যন্ত দুঃখজনক। সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবকে পুঁজি করেই ভূমিদস্যুরা পার পেয়ে যাচ্ছে।
শাহজালালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেদওয়ান নয়া দিগন্তকে বলেন, পরিবেশ আইন অনুযায়ী পাহাড় বা টিলা কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও, সিলেটে আইনের প্রয়োগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। সিলেটের অবশিষ্ট পাহাড়-টিলাগুলোর ডিজিটাল ম্যাপিং করতে হবে। পাহাড় কাটার সাথে জড়িতদের শুধু জরিমানা নয়, দৃষ্টান্তমূলক জেল ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
এ বিষয়ে বিভাগীয় পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক মো: আবুল কালাম আজাদ বলেন, সিলেটের পাহাড়ের কোনো তালিকা আমাদের কাছে নেই। তবে পাহাড়ের মাটি কাটা রোধে সিলেট পরিবেশ অধিদফতর নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা আইনে যে বিধান রয়েছে তা মেনেই কাজ করছি।



