সেনাপ্রধানসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরখাস্তে পেন্টাগনে চরম নেতৃত্ব সঙ্কট

Printed Edition
পিট হেগসেথ
পিট হেগসেথ

সিএনএন

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দফতর পেন্টাগনে এখন তীব্র পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সন্দেহের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের আনুগত্য নিয়ে সংশয়ে ভুগছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। এই অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনের জেরে সম্প্রতি আকস্মিকভাবে চাকরি হারিয়েছেন মার্কিন সেনাপ্রধান জেনারেল র‌্যান্ডি জর্জ। পেন্টাগনের বর্তমান ও সাবেক ১৫ জন কর্মকর্তার বক্তব্যে এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে পেন্টাগনের যাবতীয় তথ্য নিজের দফতরে কঠোরভাবে কুক্ষিগত করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। তার তীব্র অবিশ্বাসের কারণে সামরিক অভিযানের তথ্য জানতে সেনাদের এখন বাধ্যতামূলকভাবে বিশেষ গোপনীয়তা চুক্তিতে (এনডিএ) স্বাক্ষর করতে হচ্ছে। একই সাথে সেখানে ‘পলিগ্রাফ টেস্ট’ বা মিথ্যা শনাক্তকরণ পরীক্ষা এখন নিয়মিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। এমনকি সেনাপ্রধানের প্রশাসনিক এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ করে হেগসেথ নিজেই চারজন কর্নেলের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পদোন্নতি আটকে দেন। সৃষ্ট দূরত্ব দূর করতে গত ১ এপ্রিল সেনাপ্রধান জেনারেল জর্জ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে একটি বৈঠকের আবেদন করেছিলেন। তবে সেই বৈঠক তো হয়ইনি, উল্টো পরদিনই কোনো কারণ দর্শানো বা ব্যাখ্যা ছাড়া অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত নোটিশে তাকে বরখাস্ত করা হয়। সেনাপ্রধানের এমন নাটকীয় বিদায় পেন্টাগনের ভেতরে আস্থাহীনতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা উদ্ভূত পরিস্থিতিকে নজিরবিহীন আখ্যা দিয়ে জানান, সেখানে এখন কর্মকর্তাদের প্রতিদিন এই আতঙ্কে থাকতে হয় যে, তাদের কোনো পদক্ষেপের কারণে বসের চাকরি থাকবে নাকি চলে যাবে।

অবশ্য পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। একে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দাবি করে তিনি জানান, মূলত প্রেসিডেন্টের নীতি ও অগ্রাধিকারের সাথে সামরিক নেতৃত্বের সামঞ্জস্য বজায় রাখতেই এই রদবদল করা হয়েছে। বর্তমানে হেগসেথের নজর এড়িয়ে চুপচাপ থাকাই পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের টিকে থাকার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বাসের অভাব ও ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণের কারণে সেখানে এখন যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ দিকে সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকে হেগসেথ এটিকে বড় সাফল্য হিসেবে প্রচার করতে ব্যস্ত এবং গণমাধ্যমের যেকোনো সমালোচনামূলক প্রতিবেদনকে ‘দেশদ্রোহিতা’ হিসেবে গণ্য করছেন। তবে হরমুজ প্রণালী বন্ধে ইরানের পদক্ষেপের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সঙ্ঘটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হওয়ার পর, হেগসেথ নতুন করে তথ্য ফাঁসের তদন্ত শুরু করেছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এখন সেনাদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে এক সেনা কর্মকর্তা বলেন, আমাদের সাথে শত্রুর মতো আচরণ করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি অন্যান্য বিভাগের প্রধানদের সাথেও হেগসেথের দ্বন্দ্ব চলছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে সেনাবাহিনীর সচিব ড্যান ড্রিসকলকে শুরু থেকেই সন্দেহের চোখে দেখছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এর আগে সেনাপ্রধানকে সরানোর কয়েক মাস আগেই তিনি সেনাবাহিনীর ভাইস চিফ অব স্টাফ জেনারেল জেমস মিঙ্গুসকে পদচ্যুত করেন। সেই পদে তিনি নিজের সামরিক সহকারী জেনারেল ক্রিস লানেভকে বসান, যিনি এখন ভারপ্রাপ্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। জেনারেল জর্জের বিদায়ের কয়েক সপ্তাহ পর নৌবাহিনীর সচিব জন ফেলানকেও হুট করে বরখাস্ত করা হয়। মূলত জাহাজ নির্মাণে ধীরগতি এবং ট্রাম্পের সাথে ফেলানের সরাসরি যোগাযোগকে হেগসেথ সন্দেহের চোখে দেখাই এই বরখাস্তের মূল কারণ বলে জানা গেছে। পেন্টাগনের অভ্যন্তরে এত অসন্তোষ ও নাটকীয়তা চললেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো হেগসেথকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি মন্ত্রিসভার এক শুনানিতে নিজের পাশে বসা হেগসেথকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, আমাদের যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ একদম উপযুক্ত চরিত্র ও যুদ্ধ ভালোবাসে।