শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণার পরও গাজায় ইসরাইলি হামলা : নিহত ১৯

Printed Edition
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহে ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি যানবাহনের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছেন ফিলিস্তিনিরা  : ইন্টারনেট
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহে ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি যানবাহনের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছেন ফিলিস্তিনিরা : ইন্টারনেট

আলজাজিরা ও আনাদোলু

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘ঐতিহাসিক’ পরিকল্পনা ঘোষণার মধ্যবর্তী সময়েও উপত্যকাটিতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। এতে অন্তত ১৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আল-শিফা হাসপাতালের চিকিৎসা সূত্রের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানায়, গত রোববারের এসব হামলায় গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলের আল-সুসি টাওয়ারে। একটি আবাসিক ভবনে পরিচালিত বিমান হামলায় ৩৩ বছর বয়সি আবদুল্লাহ আবু তাইফ, তার সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আবির আনান (২৯) এবং তাদের পাঁচ বছরের ছেলে আজ্জাম প্রাণ হারান। এ ছাড়া দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের আল-কারারা এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্টে হামলায় মাহমুদ আল-হামস (৩৮), তার স্ত্রী ফাতিমা (৩৭) এবং তাদের ছোট মেয়েসহ একই পরিবারের তিনজন নিহত ও অপর তিনজন আহত হন। মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহে নিজ বাড়িতে হামলায় ৬৮ বছর বয়সি কামু আবু মুয়াইলিক ও তার ৫৯ বছর বয়সি স্ত্রী হুদা নিহত হন। একই এলাকায় মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় দুই ভাই প্রাণ হারান। উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে সরাসরি চালানো হামলায় একজন এবং খান ইউনুসের আল-মাওয়াসিতে বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতে হামলায় একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হন। পাশাপাশি গাজা সিটির রেমাল এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতে ড্রোন হামলায় দু’জন এবং শহরের অন্য একটি এলাকায় গাড়িতে হামলায় আরো চারজনের মৃত্যু হয়।

মোট নিহত বেড়ে ৭৩ হাজার ৩৭৫

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সোমবার জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলমান ইসরাইলি হামলায় মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৩৭৫ জনে এবং আহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৭৪ হাজার ২২০ জনে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১৯ জন নিহত ও ৩৫ জন আহত হয়েছেন। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, গত ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া নতুন যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত এক হাজার ২৫০ জন নিহত এবং চার হাজার ১১০ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৮০৪টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। অব্যাহত আক্রমণ ও নিরাপত্তার অভাবে বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপ ও সড়কে আটকে থাকলেও স্বাস্থ্যকর্মী বা সিভিল ডিফেন্স সদস্যরা তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না।

জুলাইয়ে পশ্চিম তীরে ২,২৫৬টি হামলার রেকর্ড

ফিলিস্তিনের কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশনের সোমবার প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর মোট দুই হাজার ২৫৬টি হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা। আনাদোলু এজেন্সির তথ্যানুযায়ী, এর মধ্যে বাহিনীটি একাই এক গাজার ৪৫৮টি এবং বসতি স্থাপনকারীরা ৭৯৮টি হামলা চালিয়েছে। কমিশনের প্রধান মুয়াইয়াদ শাবান এই আক্রমণকে ‘নজিরবিহীন’ আখ্যা দিয়ে জানান, শুধু জুলাইতেই নাবলুসে ২২৮টি, হেবরনে ২১২টি এবং রামাল্লাহ ও আল-বিরেহ এলাকায় ১৫৩টি হামলা ঘটে। চলতি বছরের শুরু থেকে বসতি স্থাপনকারীরা মোট চার হাজার ২৮৬টি হামলা চালিয়েছে।

জুলাইয়ে এসব হামলায় সাত ফিলিস্তিনি নিহত হন, যার মধ্যে নাবলুসের পশ্চিমে তেল গ্রামেই মারা যান চারজন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের আক্রমণে এক হাজার ১৮২ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত, প্রায় ১৩ হাজার আহত এবং প্রায় ২৪ হাজার মানুষ আটক হয়েছেন। তা ছাড়া, জুলাই মাসে ৩১টি সামরিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ৮৩১ দুনাম জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং ৮০টি উচ্ছেদ অভিযানে ৮০টি বসতবাড়িসহ ১৬৫টি স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ বিষয়ে ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আগাবেকিয়ান অভিযোগ করেছেন, এই হামলাগুলো উগ্র ডানপন্থীদের একক কাজ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ হিসেবে জমি উচ্ছেদ ও বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা। ইসরাইল সরকার বসতি স্থাপনকারীদের অস্ত্র দিলেও তাদের কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত করছে না। ফলে কাগজে-কলমে ঘোষণা না দিলেও বাস্তবে প্রতিদিন ভূমি দখল ঘটছে এবং এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াত ফিলিস্তিনিদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

জেরুসালেমে আর্মেনিয়ান চার্চে হামলা

জেরুসালেম গভর্নরেটের বরাতে জানা যায়, রোববার সন্ধ্যায় জেরুসালেমের পুরনো আর্মেনিয়ান চার্চে সশস্ত্র ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা পাথর নিক্ষেপ করে এবং প্রবেশপথে জড়ো হয়ে থুতু ফেলে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হিসেব মতে, পূর্ব জেরুসালেমসহ অধিকৃত পশ্চিম তীরে বর্তমানে ১৫৬টি বসতি ও ৩৬০টি আউটপোস্টে প্রায় সাড়ে সাত লাখ ইসরাইলি বসবাস করছে, যারা জোরপূর্বক ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদে ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।