রঙ পেন্সিল : মামুন সরকার

Printed Edition
রঙ পেন্সিল :    মামুন সরকার
রঙ পেন্সিল : মামুন সরকার

তৃতীয় শ্রেণীর ছোট্ট মেয়ে তিথি। রঙ পেন্সিলের একটি বড় বাক্স পেয়েছে জন্মদিনে। খুশিতে তার চোখ মুখ চকচক করছে। সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে থেকেই সে কেবল ভাবছে উপহারের পেন্সিলগুলো কিভাবে কাজে লাগানো যায়। আর কি কি আঁকা যায় তা মনে মনে ঠিক করে ফেলে।

স্কুল থেকে বাসায় ফিরে প্রথমেই সে আঁকল একটি ঘর। লাল ছাদের ছোট্ট ঘর, পাশে একটি আমগাছ। গাছে সবুজ পাতার ফাঁকে ডালে ডালে পাকা হলুদ আম ঝুলছে। আঁকতে আঁকতে সে নিজেই বলে উঠল, আহা! যদি সত্যি এই আম খাওয়া যেত!

তারপর আঁকল একটি পাখি। নীল ডানা মেলে উড়ছে আকাশে। কিন্তু সাদা কাগজে পাখি দেখে তিথির মন ভরল না। সে ভাবল, পাখি তো আকাশে থাকে, কাগজে নয়। তাই দুষ্টুমি করে সে লাফিয়ে গিয়ে বসার ঘরের দেয়ালে আঁকতে শুরু করল।

মা রান্নাঘর থেকে ডাক দিলেন, তিথি, কী করছ মা তুমি?

তিথি হেসে উত্তর দিলো, মা আমি ছবি আঁকছি। এসে দেখে যাও দেয়ালে পাখি উড়ছে।

মা এসে দেখেন দেয়ালে লাল বাঁকা ঠোঁটে সবুজ ডানা মেলে একঝাঁক পাখি উড়ছে। মা মনে মনে একটু রাগলেন, আবার মৃদু হেসে বললেন, হায় আল্লাহ, তুমি যে দেয়াল নষ্ট করলে তা কে রঙ করবে আবার? তোমার আব্বু দেখলে মেরেই ফেলবে। মা দেয়ালে না এঁকে খাতা নিয়ে আঁকাআঁকি করো।

তিথি কোনো জবাব দিলো না। মায়ের কথায় মনে মনে রাগ করল। দেয়ালে আঁকা বন্ধ করে এবার দৌড়ে গিয়ে বাবার পত্রিকার পাতা খুলে আঁকতে শুরু করল। লাল সূর্য আঁকল আর আঁকল নদী। নদীতে নৌকাতে বৈঠা ধরে বসে আছে এক কিশোর ছেলে। পরনে লুঙ্গি আর সেন্ড্র গেঞ্জি। নদীতে এক জেলে জাল ফেলে মাছ ধরছে। কয়েকটি সাদা পৃষ্ঠা রঙে রঙিন হয়ে উঠল। কাঁচা হাতের আঁকা হলেও রঙের মিশেল খুব চমৎকার। চোখে পড়ার মতো।

বাবা রাতে পত্রিকা হাতে নিয়ে দেখলেন খবরের জায়গায় শুধু আঁকিবুকি। বুঝতে বাকি থাকে না এ কাজা কে করতে পারে। বাবা মিষ্টি সুরে তিথিকে কাছে ডেকে বলেন, এ যেসব খবর মুছে দিয়ে নদী বানিয়ে ফেলেছ! তাহলে আজ কীভাবে খবর পড়ব?

তিথি খিলখিল করে হেসে উঠল, আজ খবর পড়বা না। আজ আমার আঁকা ছবি পড়বা। সূর্য দেখবা, নদী দেখবা।

তিথির কথায় বাবা মোটেও রাগ করলেন না। হাত ধরে বুকের কাছে নিয়ে বললেন, আঁকাআঁকি ভালো। তবে যেখানে সেখানে নয়। এখন থেকে ড্রয়িং খাতায় আঁকবে। তা নিয়ে স্কুলের বন্ধুদের দেখাবে। ওরা তোমার ছবির প্রশংসা করে বলবে, তিথি তুমি তো বেশ ভালো আঁকতে পারো। এ খবর পৌঁছে যাবে তোমার টিচার ম্যাডামের কাছে। ম্যাডামও তোমার আঁকা দেখে বলবে, তুমি তো বেশ আঁকিয়ে।

বাবার মিষ্টি কথায় তিথি খুব খুশি হয়ে বলে, ঠিক আছে বাবা। কাল থেকে ড্রয়িং খাতায় আঁকব।

বাবা দু’হাতে আলতো করে তিথির গাল টেনে বলেন, কে আমার তিথি মা দুষ্ট। আমার তিথি মায়ের মতো ভালো মেয়ে আর একটিও হয় না।

তিথি বাবার আদর নিয়ে পাশের ঘরে ঢুকতেই ছোট ভাই আদি এলো হাতে কিছু রঙ পেন্সিল নিয়ে। আদির বয়স তিনের মতো। বই-খাতার পাতা ছেঁড়াতে ওস্তাদ। দু’জন মিলে বইয়ের পাতায় ফুল আঁকতে লাগল। কিন্তু আঁকতে গিয়ে তারা বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলল।

মা দু’ভাইবোনের কাণ্ড দূর থেকে খেয়াল করে বলেন, আহা, বইটা তো নষ্ট হয়ে গেল তো!

তন্ময় ভ্রƒ কুঁচকাল। তিথি হেসে বলল, কোনো সমস্যা নেই। বই তো গল্প বলে, আমরা ছবি বানালাম।

তাদের এই দুষ্টুমি দেখে মা একটু চিন্তিত হয়ে বললেন, আঁকা তো ভালো জিনিস; কিন্তু যেখানে সেখানে আঁকলে জিনিসপত্র নষ্ট হয়। এর কোনো সুন্দরতা থাকে না।

মায়ের কথা শুনে বাবা একটি বুদ্ধি দিলেন। তিনি পুরনো কিছু কাগজ, খাতা, আর একটি বড় সাদা বোর্ড এনে বললেন, এই বোর্ডটিই তোমাদের দেয়াল। যা খুশি আঁকো। এতে ঘরও নষ্ট হবে না, বইও ছিঁড়বে না। তিথি আর আদি আনন্দে লাফিয়ে উঠল। এবার তারা বোর্ডে বিশাল একটা গ্রাম আঁকল। ঘরবাড়ি, মাঠ, নদী, আকাশে রংধনু, স্কুল, এমনকি নিজেরা দাঁড়িয়ে আছে এমন ছবিও আঁকল। মা-বাবা অবাক হয়ে দেখলেন, ওরা ছোট্ট হলেও রঙ পেন্সিলের কারুকাজে যেন এক নতুন দুনিয়া বানিয়ে ফেলেছে।

মা মৃদু হেসে বললেন, তোমাদের যেখানে ইচ্ছে আঁকো, তবে সুন্দরভাবে। এভাবেই তোমাদের শেখা শুরু হোক।

তিথি মায়ের কাছে গিয়ে বলল, মা, আমি বড় হয়ে ছবি আঁকার মাস্টার হবো। তখন সবাই বলবে, দেয়ালে পাখি আঁকা তিথি আজ সত্যিই চিত্রশিল্পী।

মা আদরে জড়িয়ে ধরলেন তিথিকে। আদি এসেও মাকে জড়িয়ে ধরে।

আর সেই থেকে রঙ পেন্সিলের সব দুষ্টুমি চলে এলো বোর্ডে- যেখানে ঘর নষ্ট হয় না, বই ছিঁড়ে যায় না; কিন্তু শিশু মনের স্বপ্নগুলো বেঁচে থাকে রঙ পেন্সিলের আঁচড়ে। হ