নিজস্ব প্রতিবেদক
‘জুলাই বিপ্লবোত্তর শিক্ষা সংস্কার ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষাসহ শিক্ষার প্রতিটি স্তরে ধর্মীয়, নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষাব্যবস্থা চালুকরণের মাধ্যমে শিক্ষাখাতে আমূল সংস্কার করতে হবে।
গতকাল শনিবার বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বক্তারা এ কথা বলেন। ফেডারেশনের উপদেষ্টা ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপির সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। প্রধান বক্তা ছিলেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. ইলিয়াস মোল্লা এমপি, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, শহীদ জাবের ইব্রাহিমের মা সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, লেখক ও ইসলামী চিন্তাবিদ মুফতি আলী হাসান উসামা প্রমুখ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক। বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি অধ্যাপক রবিউল ইসলামের পরিচালনায় সেমিনারে আরো বক্তৃতা করেন, বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক এ বি এম ফজলুল করিম, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা ড. খলিলুর রহমান মাদানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো: শহিদুল ইসলাম প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেখানে আমাদের আত্মপরিচয় বিলীন করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ধর্ম পছন্দ করে না এমন একটা গোষ্ঠী আমাদের প্রশাসনে বিচরণ করছে। আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষাসহ শিক্ষার প্রতিটি স্তরে ধর্মীয়, নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষাব্যবস্থা চালুকরণের মাধ্যমে শিক্ষা খাতে আমূল সংস্কার করতে হবে।
প্রধান বক্তা আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, হিউম্যান রিসোর্সের জন্য অবশ্যই শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষকে হিউম্যান রিসোর্স (মানবসম্পদ) হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। তিনি আরো বলেন, জাতি হিসেবে টিকে থাকতে হলে, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে অবশ্যই শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য বন্ধ করে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম উপকরণ হচ্ছে বই। তাই সব সেক্টরের পৃথক পৃথক বই লেখা বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষকদের রাজনীতিকরণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ শিক্ষকরা রাজনীতিতে যুক্ত থাকলে শিক্ষক নিয়োগে, ভিসি নিয়োগে দলীয়করণ করা হয়। ফলে অযোগ্যরা নিয়োগ পেয়ে যায়। যোগ্যরা নিয়োগ বঞ্চিত হয়। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লব শুধু ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে হয়নি বরং বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধেও এই বিপ্লব। এই বিপ্লব বিদেশী সহায়তা ছাড়া নিজস্ব শক্তিতে সংঘটিত হয়েছে। ফলে আগামী প্রজন্মকে কেউ বলতে পারবে না তোমাদের ফ্যাসিবাদবিরোধী বিপ্লব আমাদের সহযোগিতায় সংঘটিত হয়েছে। তাই আগামীতে আমাদের আরো শক্তিশালী প্রজন্ম তৈরি হবে। সেই প্রজন্মকে ধর্মীয়, নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের বিকল্প নেই।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেন, বর্তমান সরকারদলীয় লোকজনকে শিক্ষাব্যবস্থায় পুনর্বাসনে বেশি মনোযোগী। ফলে যোগ্যরা বঞ্চিত হচ্ছে। দলীয় বিবেচনায় অযোগ্য লোকদের শিক্ষাব্যবস্থায় পুনর্বাসন অব্যাহত থাকলে একটি মেরুদণ্ডহীন জাতি তৈরি হবে। শিক্ষার প্রতিটি লেভেলে একজন করে কুরআন শিক্ষার শিক্ষক নিয়োগ করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। ড. ইলিয়াস মোল্লা এমপি বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা লক্ষ্যহীন। তাই লক্ষ্য স্থির করে আমাদের শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে।
ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কার সম্ভব হবে যদি সরকার দেশ গড়তে চায়। সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া রাষ্ট্র সংস্কার সহজ নয়। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ থেকে শুধু টাকা পাচার হয়নি, মেধাও পাচার হয়ে গেছে। এর একমাত্র কারণ কোনো সরকার মেধার মূল্যায়ন করেনি। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা মুখে যা বলেন কাজ করে তার বিপরীতটা। তিনি পালাবেন না বলে পালিয়ে গেছেন সুতরাং দেশে আসবেন বললে সেটিও তার উল্টোটাই হবে। রোকেয়া বেগম বলেন, দেশ সংস্কার ছাড়া শিক্ষা সংস্কার হবে না। তিনি বলেন, শহীদ জাবের ইব্রাহিমসহ জুলাইয়ের শহীদ এবং আহত ও পঙ্গুত্ব বরণকারীরা রাষ্ট্র সংস্কার চেয়েছে, সংশোধন নয়। তাই সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বিরোধী দল সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে।
ড. খ ম কবিরুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নয়; এটি ছিল জুলাই বিপ্লব। তবে এই বিপ্লব শেষ হয়নি। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা হাজার-হাজার শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে পিয়ন পদে আবেদন করেছে! এটি জাতির জন্য লজ্জার।
ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, উন্নত বিশ্বে শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় এবং শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ভারতীয় প্রেসক্রিপশনে আওয়ামী লীগ তৈরি করেছে। এই শিক্ষাব্যবস্থায় কেবলমাত্র কেরানি তৈরি হবে।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন সরকার এক হাজার ৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে যেখানে এক পয়সাও গবেষণার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়নি!
মুফতি আলী হাসান উসামা বলেন, এমন একটা শিক্ষানীতি প্রয়োজন যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না। তিনি বলেন, দেখা যায় মাদরাসাার শিক্ষার্থীদের সমাজের তৃতীয় শ্রেণীর মনে করা হয়! এখান থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাকে সর্বজনীন করতে হবে।



