ডিজিটাল টাকা : মো: রাজিব হুমায়ুন

Printed Edition
ডিজিটাল টাকা : মো: রাজিব হুমায়ুন
ডিজিটাল টাকা : মো: রাজিব হুমায়ুন

সাল তখন ২০৫০। এই সময়ে বাংলাদেশ কাগজে-কলমে অনেক এগিয়েছে। উড়ন্ত বাস আকাশ চিরে চলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অফিসে মানুষ কম; মেশিন বেশি, ডিজিটাল আদালতে রায় আসে মুহূর্তে। বাইরে থেকে দেখলে দেশ আধুনিকতার শিখরে। কিন্তু মানুষের ভেতরের অস্থিরতা আটকে আছে একটা প্রশ্নেই, ‘টাকার মান কই?’

বেতনের অঙ্ক বেড়েছে, বাজেটের সংখ্যা আকাশ ছুঁয়েছে, কিন্তু বাজারে গেলে সেই টাকায় জিনিস কেনা যায় আগের চেয়ে কম। এক সময় যে ১০ টাকায় চাল-ডাল-সবজি কেনা যেত, এখন সেই দশ টাকায় একটা প্লাস্টিকের ব্যাগও মেলে না। নোটের বান্ডিল মোটা হয়েছে, অথচ থলের ওজন হালকা।

একজন সর্বনি¤œ গ্রেডের সরকারি কর্মচারী মাসে এক লাখ টাকা বেতন পান, তবু মাসের শেষে হিসাব মেলাতে হিমশিম খান। অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীরা চোখের জল লুকিয়ে বলেন, ‘এই টাকার দাম আগের মতো নেই!’

এই পরিস্থিতিতে একদিন হঠাৎ করেই রাষ্ট্রপ্রধান জাতির উদ্দেশে জরুরি ভাষণ দিলেন। রাষ্ট্রপ্রধানের পেছনের বিশাল পর্দায় ভেসে উঠল, ‘ডিজিটাল টাকার নোট।’

রাষ্ট্রপ্রধান বললেন, ‘প্রিয় নাগরিকবৃন্দ, আজ থেকে বাংলাদেশে চালু হচ্ছে ডিজিটাল টাকার নোট। ডিজিটাল টাকায় এক টাকার মান হবে বর্তমান বাজারের ১০ টাকার সমান। ধাপে ধাপে পুরোনো টাকা তুলে নেয়া হবে। বেতন, বাজেট, পেনশন- সব পুনর্গণনা হবে। কিন্তু দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অপরিবর্তিত থাকবে।’

সারা দেশ থমকে গেল।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রজ্ঞাপন জারি হলো :

ব্যাংকে থাকা ১০ টাকা = ডিজিটাল ১ টাকা

১০০ টাকা = ডিজিটাল ১০ টাকা

১,০০০ টাকা = ডিজিটাল ১০০ টাকা

সংখ্যা কমবে। কিন্তু মান থাকবে ঠিক আগের মতো।

সরকারি ঘোষণা এলো, ‘যিনি আগে মাসে এক লাখ টাকা বেতন পেতেন, ডিজিটাল টাকায় তার বেতন হবে ১০ হাজার টাকা।’

যে পেনশন ছিল ৫০ হাজার টাকা,

তা হয়ে গেল পাঁচ হাজার টাকা।

রাষ্ট্রের বার্ষিক বাজেট, যা একসময় ছিল ১০ লক্ষ কোটি টাকা, নতুন হিসাবে দাঁড়াল এক লক্ষ কোটি টাকা।

সংখ্যা ১০ ভাগে নেমে এলো, কিন্তু হাসপাতালের শয্যা কমল না, স্কুলের বই কমল না, রাস্তা, সেতু, ভাত- কিছুই কমল না। শুধু কমল টাকার অঙ্কের ভার, হালকা হলো হিসাবের বোঝা।

রফিক, একজন সাধারণ মুদি দোকানি, প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। সে ভাবল, ‘এক টাকা দিয়ে ১০ টাকার জিনিস? এটা আবার কী রসিকতা!’

রফিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ছিল এক লাখ টাকা। নতুন হিসাব অনুযায়ী তা হয়ে গেল মাত্র ১০ হাজার টাকা। মোবাইল অ্যাপে ব্যালেন্স দেখে তার বুক ধক করে উঠল।

‘আমার টাকা কই গেল?’

পরক্ষণেই সরকারের নোটিফিকেশন ভেসে উঠল, ‘ভয় নেই। আপনার ক্রয়ক্ষমতা অপরিবর্তিত।’

পরদিন রফিক বাজারে গেল পরীক্ষা করতে। আগে যে এক কেজি চাল কিনতে লাগত ১০০ টাকা, আজ দোকানদার বলল, ‘ভাই, ১০ টাকা।’

রফিক ডিজিটাল ১০ টাকার নোট বাড়িয়ে দিল। আশ্চর্য! ঠিক আগের মতোই চাল পেল। সে একে একে তেল, ডাল, সবজি কিনল। হিসাব মিলল।

সংখ্যা কমেছে। কিন্তু জীবনের ওজন আগের মতোই। ধীরে ধীরে মানুষের মানসিকতা বদলাতে লাগল।

আগে পকেটে পাঁচ হাজার টাকা থাকলেও মনে হতো কম। এখন পকেটে এক হাজার টাকা থাকলেই মনে হয়, ‘এই তো অনেক!’

টিভি টকশোতে অর্থনীতিবিদরা বললেন,

‘এটা টাকা কমানো নয়, এটা সংখ্যার জঞ্জাল পরিষ্কার করা।’ একদিন সন্ধ্যায় রফিক তার ছেলেকে বলল, ‘জানিস, এক সময় মানুষ কোটি কোটি টাকা নিয়ে গর্ব করত।’

ছেলে হেসে বলল, ‘বাবা, এত বড় সংখ্যা মনে রাখা কত ঝামেলার ছিল!’

রফিক জানালার বাইরে তাকাল।

শহরের আলো ঝলমল করছে।

ডিজিটাল বোর্ডে ডিজিটাল টাকার হিসাব ঝিকমিক করছে। সেই ডিজিটাল টাকা নতুন সভ্যতার প্রতীক।