সংসদ প্রতিবেদক
- সংসদে আইসিটি আইনের সংশোধনীসহ ১৪টি বিল পাস, ১টি উত্থাপিত
- বিরোধীদলীয় নেতা ও আইনমন্ত্রীর বিতর্ক
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের বিচার নিশ্চিত করতে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬’-সহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা ১৪টি অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করতে বিল আকারে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। তবে, বিরোধী দলের নোট অব ডিসেন্ট থাকা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬ সংসদে উত্থাপিত হলেও তা পাস হয়নি।
গতকাল মঙ্গলবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দশম দিন সকালে আটটি এবং সন্ধ্যায় আরো ছয়টি বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা উত্থাপনের পর বিলগুলো সরাসরি কণ্ঠভোটে পাস হয়। আইসিটি বিল সংসদে পাস হওয়ার মাধ্যমে গুমকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এতে সভাপতিত্ব করেন। সকালের সেশনে পাস হওয়া আটটি বিলের দফাওয়ারি কোনো সংশোধনী প্রস্তাব ছিল না। তাই বিলের ওপর সংসদে কোনো আলোচনা হয়নি।
পাস হওয়া বিলগুলোর মধ্যে অধিবেশনের শুরুতে ‘হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ বিল’ সংসদে পাসের জন্য প্রস্তাব করেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসংক্রান্ত বিলটি পাসের প্রস্তাব করতে গিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৩ সালের আইনের এ সংশোধনীর ফলে গুমের সাথে সম্পৃক্ত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার আইনি বাধা দূর হলো এবং সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটল। গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করতে এ বিলটি পাস করা হয়।
বিল পাসের আগে এর উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এ বিলের মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের বিচারকে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য গুমকে একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছি। যারা বলছেন আমরা গুমের বিচার চাচ্ছি না, তাদের বলবো- এ আইনটা ভালো করে পড়ে দেখবেন। গুম আগে মানবতাবিরোধী অপরাধের তালিকায় ছিল না। আমরা তা অন্তর্ভুক্ত করে বিচারের ব্যাপারে আমাদের সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছি।’
আইনমন্ত্রী আরো বলেন, ‘বাইরে গুমের বিচার করার ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছাকে অনেকে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছেন। এ সরকার গুমের সাথে সম্পৃক্ত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে কতটা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তা এ বিলের মাধ্যমে পুরো সংসদ ও দেশবাসীকে অবহিত করলাম।’
বিলটি পাস হওয়ার পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘আইনমন্ত্রী বিল পাসের প্রস্তাব করতে গিয়ে যা বলেছেন তা অনাহূত। এটা না বললেই ভালো হতো। নির্দিষ্ট সময় যখন আসবে তখন এ বিষয়ে কথা বলবো।
জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, বাইরে অনেকে গুমের বিচার নিয়ে, সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছেন। সে কারণে এ বিল উপস্থাপনের আগে ক্লিয়ার করেছেন যে গুমের বিচারে সরকার কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বাইরে কতজন কত কথা বলে। আপনি সংসদের আলোচনার মধ্যে, সংসদ সদস্যদের মধ্যে বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেন। আইনবিধি অনুযায়ী যেটা গৃহীত হবে সেটা নিয়ে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।’
উল্লেখ্য যে, এর আগে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস অ্যাক্টের অধিকতর সংশোধনকল্পে এ বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয়। বিলটি পাসের মধ্য দিয়ে গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার আইনি ভিত্তি আরো শক্তিশালী হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাস হওয়া বিলগুলোর মধ্যে পৃথকভাবে কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, সিভিল কোর্টস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ও রেজিস্ট্রেশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল সংসদে পাসের প্রস্তাব করেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। পৃথকভাবে বিলগুলো কণ্ঠভোটে পাস হয়।
পাস হওয়া অন্য বিলগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত। মূলত নাম পরিবর্তনে আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। সেগুলোকে অনুমোদন করতে বিল পাস করা হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তিনটি বিল সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সেগুলো হলো ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল ও শেখ হাসিনা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন)।
দ্বিতীয় বিলটি উত্থাপনের সময় সালাহউদ্দিন আহমদ মজা করে বলেন, ‘খুব দুঃখের ব্যাপার। এতক্ষণ তো যা বললাম, এখন আবার শেখ হাসিনা বলতে হচ্ছে।’
পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বকুল ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট (সংশোধন) বিল’ পাসের প্রস্তাব করেন। বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
সন্ধ্যায় সম্পূরক কার্যসূচিতে আরো সাতটি বিল উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ছয়টি বিল পাস হয় এবং একটি বিল সংসদে উত্থাপিত হলেও তা পাস হয়নি।
পাস হওয়া বিলগুলো হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬, নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) (২০২৪-২৫ অর্থবছর) বিল, ২০২৫, নির্দিষ্টকরণ (২০২৫-২০২৬ অর্থ বছর) বিল, ২০২৬, বঙ্গবন্ধু দারিদ্র্য বিমোচন ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (সংশোধন) বিল, ২০২৬, শেখ রাসেল পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, রংপুর (সংশোধন) বিল, ২০২৬ ও বাণিজ্যিক আদালত বিল, ২০২৬।
এ ছাড়াও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬ সংসদে উত্থাপিত হলেও তা পাস হয়নি। এ বিলে বিরোধী দলের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে সংসদে অনুমোদনের সুপারিশ করেছিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি রহিত করা এবং ১৬টি পরবর্তী সময়ে আরো শক্তিশালী করে নতুন বিল আনার সুপারিশ করা হয়।
এর আগে গত সোমবার সাতটি অধ্যাদেশ বিল আকারে সংসদে পাস হয়। পাস হওয়া বিলগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ভোটার তালিকা (সংশোধন) আইন-২০২৬’, ‘রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০২৬’, ‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সংশোধন আইন-২০২৬’, ‘নির্বাচন কমিশন কর্মচারী (বিশেষ বিধান) সংশোধন আইন-২০২৬’, ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ (সংশোধন) আইন-২০২৬’, ‘জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) রহিতকরণ আইন-২০২৬’ এবং ‘বাংলাদেশ ল অফিসার্স (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০২৬’।
একই দিন সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিচার নিয়োগের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করতে জাতীয় সংসদে বিল তোলা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করতে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলন করতে বিল আনা হয়েছে। বিরোধী দলের আপত্তির কারণে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) আইন-২০২৬’, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ আইন-২০২৬’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২ (রহিতকরণ) আইন-২০২৬’- এ তিনটি বিল আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে। আলোচনা শেষে এগুলো পুনরায় পাসের জন্য উত্থাপন করা হবে।
এর আগে গত রোববার দু’টি বিল সংসদে পাস হয়। একটি হলো ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যানসিয়াল করপোরেশন ও স্বশাসিত সংস্থাসমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ বিল-২০২৬’ এবং ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) বিল, ২০২৬’।



