ধর্ষণের শাস্তি ও মৃত্যুদণ্ডে শরিয়াহর মূলনীতি

Printed Edition

সানা উল্লাহ মুহাম্মাদ কাউসার

ইসলাম মানবজাতির জন্য একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধানের নাম। ইসলামী শরিয়াহতে মানুষের যাবতীয় বিধি-বিধান, আইন-কানুন নিহিত রয়েছে। ইসলামী শরিয়াহর শাস্তি তিন প্রকার। যথা- ১. কিসাস (যথাযথ বৈধ প্রতিশোধ); ২. হুদুদ (দৃষ্টান্তমূলক নির্ধারিত শাস্তি), ৩. তাজির (ভীতিপ্রদর্শনের জন্য উপযুক্ত শাস্তি)।

কিসাস-প্রতিশোধ : সব ধরনের হত্যাকাণ্ডের জন্য কিসাস। এখানে ইচ্ছাকৃত/অনিচ্ছাকৃত সব ধরনের হত্যা এবং হত্যার প্রচেষ্টায় অঙ্গহানির শাস্তি। যেমন- প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং সব রকমের যখমের জন্য সমপর্যায়ের বদলা। (সূরা মায়িদা-৪৫)

তবে যদি ভিক্টিমের প্রতিনিধি ক্ষমা করে দেয় বা শাস্তি হিসেবে কিছুটা হ্রাস করে দেয় তাহলে অপরাধী কোনোরকম কার্পণ্য ছাড়াই ‘দিয়াত’(রক্তপণ) প্রদান করবে। (সূরা বাকারা-১৭৮)

‘দিয়াত-ক্ষতিপূরণ’ হবে চারভাবে, যথা- ক. পূর্ব থেকেই নির্ধারিত; (সূরা নিসা, আয়াত-৯২), খ. অপরাধী অসমর্থ হলে অভিভাবক; গ. অথবা সরকার বহন করবে (মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদিস নং-১৫৫৮) এবং ঘ. ক্ষমা (ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে)। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১৩৪)

হুদুদ তথা দৃষ্টান্তমূলক নির্ধারিত শাস্তি : ক. ব্যভিচারী নারী-পুরুষ উভয়কে ১০০ বেত্রাঘাত (সূরা নুর, আয়াত-০২); খ. কারো উপর ব্যভিচারের মিথ্যারোপকারীকে ৮০ বেত্রাঘাত (সূরা নুর, আয়াত-০৪); গ. ধর্ষককে রজম (প্রস্তরাঘাত) করে হত্যা (তিরমিজি-১৪৫৪); গ. পেশাদার চোরকে হস্তকর্তন করা (সূরা আল মায়িদা, আয়াত-৩৮), ঘ. ডাকাতি, সন্ত্রাসী কিংবা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীকে শূলে চড়িয়ে হত্যা, নতুবা বিপরীত দিকের হাত পা কর্তন করা অথবা দেশান্তর করে দেয়া (সূরা আল মায়িদা, আয়াত-৩৩); ঙ. মদ্যপানকারীকে ৮০ বেত্রাঘাত করা (মুসলিম-৪৩০৫, ৪৩০৭, ৪৩০৮) এবং চ. ইসলাম ধর্ম ত্যাগকারী মুরতাদকে সরাসরি হত্যা (বুখারি-৬৮৭৮, মুসলিম-১৬৭৬, মাওযুয়া আল ফিকহিয়াহ, খণ্ড-২২, পৃষ্ঠা-৮১)

তাজির- (ভীতিপ্রদর্শনের জন্য শাস্তি) : উপরোল্লিখিত কিসাস ও হুদুদ ছাড়া বাকি সব ধরনের অপরাধের শাস্তি হবে তাজির অনুসারে। মনে রাখতে হবে- প্রত্যেক ফৌজদারি অপরাধ মানবতাবিরোধী। এটি ইসলামী আইনে যেমন স্বীকৃত তেমনি সংবিধানেও স্বীকৃত। সুতরাং, উপরোল্লিখিত অপরাধের বাইরে ছোটখাটো যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে তাজির প্রয়োগের বিধান নির্ধারিত।

এবার আসুন ধর্ষণের কী শাস্তি হতে পারে?

অনেকে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে তাজির (ভীতিপ্রদর্শন মূলক শাস্তি) প্রয়োগ করার কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে ধর্ষণের শাস্তি তাজির হবে না। নবসৃষ্ট অপরাধ মানেই তাজির কার্যকর নয়। কেননা, তাজিরের সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বেত্রাঘাত।

সুতরাং, ধর্ষণ কখনোই তাজির পর্যায়ের কোনো অপরাধ নয়। ধর্ষণ হলো ‘ইগতিসাব’ তথা ‘আলইকরাহ আলায যিনা’ অথবা ‘যিনা-বিল কুওয়া’, অর্থাৎ জোরপূর্বক সম্ভ্রম লুণ্ঠন। সুতরাং এ ক্ষেত্রে ধর্ষকের শাস্তি হবে ‘হদ’ (দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি) ব্যভিচারের কারণে, আর জোরপূর্বক সম্ভ্রম লুণ্ঠনের জন্য হবে ‘মুহারাবা’ (জোর করে ধর্ষণ করার শাস্তি)। এ ছাড়া মুহারাবার শাস্তি সূরা মায়িদার ৩৩ নং আয়াত মতে চার প্রকার, যথা- যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করার জন্য প্রচেষ্টা চালায়, তাদের শাস্তি হচ্ছে :

১. তাদেরকে হত্যা করা হবে (ফাঁসি); ২. অথবা শূলবিদ্ধ (গুলি) করা হবে; ৩. অথবা তাদের হাত পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে; ৪. অথবা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। (সূরা আল মায়িদা-৩৩)

ধর্ষণ কখনোই ছোটখাটো অপরাধ নয়; বরং সর্বোচ্চ অপরাধ। (সূরা ইসরা, আয়াত-৩২) সুতরাং মুহারাবার সর্বোচ্চ শাস্তিই ধর্ষকের জন্য প্রযোজ্য হবে, অর্থাৎ ‘মৃত্যুদণ্ড’। (সূরা আল মায়িদা-৩৩) রাসূল সা:-এর যুগে একবার এক মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগে ধর্ষককে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। (তিরমিজি-১৪৫৪) হানাফি মাজহাবে ধর্ষকের শাস্তি ব্যভিচারীর শাস্তির অনুরূপই বলা হয়েছে। ব্যভিচারের শাস্তি হলো ব্যভিচারী নারী-পুরুষ উভয়কেই ১০০ বেত্রাঘাত করা। (সূরা নূর-০২)

তবে ইমাম মালেক, আহমদ বিন হাম্বলসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম ও ফকিহ একমত পোষণ করেছেন- ধর্ষকের শাস্তি হলো ‘মৃত্যুদণ্ড’। (আল মুগনি লি ইবনে কুদামা-০৮/৯৮০) কারণ তারা জোরপূর্বক সম্পদ হরণের মতো জোরপূর্বক ইজ্জত হরণকেও ‘হিরাবা’ বলে গণ্য করেছেন। কুরআনে হিরাবার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (সূরা মায়িদা-৩৩) সে হিসেবে ধর্ষকের বিরুদ্ধে বর্তমানে নতুন প্রবর্তিত মৃত্যুদণ্ড আইনও শরিয়তসিদ্ধ হবে বলে ঐকমত্য পোষণ করেছেন মুহাক্কিকরা। (আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু-৭/২৯৪)

ধর্ষণের মতো বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড বন্ধ করার কার্যকর কিছু পদক্ষেপ : ১. আইনের যথোপযুক্ত প্রয়োগের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। ইসলামে কিসাস একটি জুতসই আইনের নাম। সুতরাং ধর্ষণের শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) প্রয়োগই হতে পারে নারীর সম্ভ্রম রক্ষার নিদারুণ রক্ষাকবচ। কেননা, কিসাস (যথাযথ প্রতিশোধ) নেয়ার মধ্যেই মানুষের জাগতিক জীবনে আশানুরূপ কল্যাণ রয়েছে। আর তাই মহান রব বলেন- ‘হে বিবেকসম্পন্ন লোকেরা! তোমাদের জন্য কিসাসের মধ্যে জীবন রয়েছে। আশা করা যায়, তোমরা এই আইনের বিরুদ্ধাচরণ করার ব্যাপারে সতর্ক হবে।’ (সূরা বাকারা-১৭৯), ২. ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাদান। নৈতিকতার শিক্ষা ও চর্চা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া উচিত। এ ছাড়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাইমারি লেভেল থেকে উচ্চশিক্ষার পর্যায় পর্যন্ত মান উপযোগী নৈতিকতার উপর বিশেষ ক্লাস/প্রশিক্ষণ ও বিষয় থাকা উচিত, যেখান থেকে একজন শিক্ষার্থী শিশু অবস্থা থেকে নৈতিকতার পাশাপাশি ধর্মীয় গণ্ডির ভেতরে থেকে নৈতিকতার প্র্যাকটিস করতে পারে, ৩. পাঠ্যবইয়ে যৌনতাসংক্রান্ত অধ্যায়গুলোর আলোচনা আরো মার্জিত ও কৌশলী হতে হবে, ৪. পোশাকের শালীনতা ও চলাফেরায় সাবধানতা অবলম্বন জরুরি, ৫. শিশু, শিক্ষার্থী, মেয়েদের ক্ষেত্রে তাদের অভিভাবককে সজাগ-সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে, ৬. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে। একই সাথে পর্নো সাইট, আপত্তিকর কনটেন্টযুক্ত নাটক-সিনেমা, বিজ্ঞাপন, ভিনদেশী নাটক-সিরিয়াল ইত্যাদিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে, ৭. সন্তানদের মোবাইল-ল্যাপটপ বা সোশ্যাল সাইট বাবা-মা বা বৈধ অভিভাবকদের গোচরে ব্যবহার করা নিশ্চিত করতে হবে, ৮. সন্তানদের বন্ধুর ব্যাপারে খোঁজখবর রাখতে হবে এবং তাদের চলাচলে শর্তারোপ করতে হবে, ৯. ফ্রি-মাইন্ডের নামে অবাধ চলাফেরার প্রতি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে হবে এবং ১০. ইসলামের বিধৃত মাহরাম এবং নন-মাহরাম নীতি পুরোপুরি মেনে চলতে হবে।

লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক