শ্রীমঙ্গলের তরুণ উদ্ভাবক সাজ্জাদের প্রশংসায় প্রধানমন্ত্রী

রাষ্ট্রীয় সহায়তার আশ্বাস

Printed Edition
সচিবালয়ে সাজ্জাদুল ইসলামের তৈরি পরিবেশবান্ধব পণ্য দেখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান : নয়া দিগন্ত
সচিবালয়ে সাজ্জাদুল ইসলামের তৈরি পরিবেশবান্ধব পণ্য দেখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান : নয়া দিগন্ত

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

পরিত্যক্ত ও পচা সবজি থেকে সম্পূর্ণ পচনশীল পরিবেশবান্ধব পলিথিন এবং কলাগাছের তন্তু (আঁশ) ব্যবহার করে টাইলস, ঢেউটিন ও বোর্ডের মতো প্লাস্টিক ও সিলিকন পণ্যের বিকল্প উদ্ভাবন করে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ১৮ বছর বয়সী তরুণ সাজ্জাদুল ইসলাম। এই অনন্য কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ গত রোববার দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাতের বিরল সুযোগ পান তিনি। সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী এই তরুণ প্রতিভার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তার গবেষণাকার্যক্রম এগিয়ে নিতে সর্বাত্মক রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

সাক্ষাৎকালে সাজ্জাদ পচা সবজির শ্বেতসার (স্টার্চ) ও কলাগাছের তন্তু কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরির প্রযুক্তি এবং এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিশদভাবে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গভীর আগ্রহ নিয়ে সাজ্জাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা শোনেন এবং তাকে গবেষণা অব্যাহত রাখতে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেন।

সাজ্জাদের এই উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করতে এবং স্টার্টআপ বা তহবিল (ফান্ডিং) গঠনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা রিহান আসিফ আসাদকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি তার গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) সম্পৃক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের ইকো-ফাইবার কোম্পানি ও বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট পরিদর্শনের সুযোগসহ গবেষণার সার্বিক তত্ত্বাবধানের জন্য তিনজন উপদেষ্টাও নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

নিযুক্ত উপদেষ্টারা হলেন- বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক প্রধান সমন্বয়ক ড. এস এম আব্দুল আওয়াল এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রিহান আসিফ মাহমুদ।

তরুণ উদ্ভাবক সাজ্জাদুল ইসলাম তার প্রযুক্তির কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করে জানান, এই পদ্ধতিতে পরিত্যক্ত সবজির শ্বেতসার থেকে সম্পূর্ণ পচনশীল পলিথিন এবং কলাগাছের তন্তু ব্যবহার করে টাইলস, বোর্ড, আসবাবপত্র ও মোটরযানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করা সম্ভব।

টাইলসের ফর্মুলা : সাজ্জাদের উদ্ভাবিত প্রতিটি টাইলসের ওজন প্রায় ৩০০ গ্রাম। এর মধ্যে প্রায় ২০০ গ্রাম কলাগাছের তন্তু, ৬০ গ্রাম হাইড্রো-অক্সাইড এবং ৪০ গ্রাম রেজিন ব্যবহৃত হয়। রেজিন পণ্যের স্থায়িত্ব বাড়ায় এবং হাইড্রো-অক্সাইডের রাসায়নিক কাঠামোকে আরো শক্তিশালী করে। সাজ্জাদের দাবি, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে বুলেটপ্রুফ দরজা-জানালা তৈরিও সম্ভব।

জৈব পলিথিন : সবজির স্টার্চ থেকে তৈরি এই পলিথিন মাটিতে মাত্র এক মাস এবং পানিতে তিন মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ পচে যায়। মাটিতে মেশার পর এটি জৈবসারে এবং পানিতে মৎস্যখাদ্যে পরিণত হয়ে প্রকৃতির উপকার করে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অতিরিক্ত প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমন প্রায় দুই সপ্তাহ আগে সাজ্জাদের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালে সাজ্জাদের পরিচালিত ‘কলাগাছের তন্তু থেকে ঢেউটিন ও টাইলস’ বিষয়ক গবেষণাটি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে এবং তিনি এই তরুণের সাথে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত সাজ্জাদ বলেন, ‘গত রোববার আমি ও আমার বাবা মো: নজরুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে তার সাথে দেখা করি। প্রধানমন্ত্রীর মূল্যবান সময়, আন্তরিকতা ও অনুপ্রেরণার জন্য আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। তার সাথে সরাসরি কথা বলার দিনটি আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে।’

সাজ্জাদুল ইসলাম শ্রীমঙ্গল উপজেলার সদর ইউনিয়নের মোহাজেরাবাদ এলাকার কৃষক মো: নজরুল ইসলাম ও সাহেরা বেগম দম্পতির বড় ছেলে। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। তিনি ২০২৫ সালে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পাস করেছেন। এর আগে ২০২৪ সালে পরিত্যক্ত সবজি ও কলাগাছ থেকে এই বিস্ময়কর উদ্ভাবনের মাধ্যমে তিনি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন এবং একই বছর জেলা পর্যায়ের ‘সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ’ প্রতিযোগিতায় বিশেষ স্বীকৃতি লাভ করেন।