পুঁজিবাজারে টানা তৃতীয় দিনের সংশোধন

জনমত যাচাইয়ে সংশোধিত মার্জিন বিধিমালা

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

স্বাভাবিক সংশোধনের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। গতকাল নিয়ে টানা তৃতীয় দিনের সংশোধন ঘটেছে পুঁজিবাজারগুলোতে। গতকাল সকালে লেনদেনের শুরুতেই বিক্রয়চাপে পড়ে বাজারগুলো। ঢাকায় লেনদেনের প্রথম এক ঘণ্টায় ৪০ পয়েন্টের বেশি হারায় প্রধান সূচকটি। তবে পরবর্তিতে কিছুটা হ্রাস পেলে আবার ঊর্ধ্বমুখী রূপ নেয় সূচকটি। লেনদেনের শেষভাগে এসে হারানো সূচকের পুরোটাই ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি নামমাত্র উন্নতি ঘটে সূচকের।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বাজারের এ সংশোধনে তৃতীয় দিন পার করলেও এটাকে স্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেন। তারা মনে করেন বিগত দিনগুলোতে বাজারে মূল্যস্তর বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা তুলে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। এতে বিক্রয়চাপের শিকার হচ্ছে বাজার। তবে সংশ্লিষ্ট একটি অংশের মত হলো, নতুন করে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আশঙ্কা থেকে অনেকে শেয়ার বিক্রি করতে গিয়ে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি করছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর বিশে^র সব পুঁজিবাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। জ¦ালানি তেলের সঙ্কট সৃষ্টি হয়। এ সময়ে প্রায় দু’মাস মন্দায় আক্রান্ত ছিল বাজারগুলো। তবে পরবর্তিতে বিবদমান উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলে বিশে^র পুঁজিবাজারগুলো হাঁফ ছেড়ে বাচেন। মন্দা কাটিয়ে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয় বাজারগুলো। এখন আবারো নতুন করে যুদ্ধ শুরুর কথা শোনা যাচ্ছে, যা বিনিয়োগকারীদের মাঝে শঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১ দশমিক ৯০ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ৫ হাজার ৮৫৫ দশমিক ৭২ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল সোমবার দিনশেষে ৫ হাজার ৮৫৭ দশমিক ৬২ পয়েন্টে স্থির হয়। তবে দিনের শুরুতে যে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হয় তাতে প্রথম ঘণ্টায়ই ৪০ পয়েন্টের বেশি হারায় প্রধান সূচকটি। তবে দিনের শেষভাগে হারানো সূচকের পুরোটাই ফিরে পায় বাজারটি। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ যথাক্রমে ১ দশমিক ৯০ ও দশমিক ৬০ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচকটি ৮ দশমিক ০৬ পয়েন্ট হারায় গতকাল। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৫৪ দশমিক ০৯ ও ২৫ দশমিক ৯০ পয়েন্ট।

সংশোধনের কারণে গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের অবনতি ঘটে। পুঁজিবাজারটি গতকাল ৯৬৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিনের চেয়ে ১০৪ কোটি টাকা কম। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা। তবে চট্টগ্রামে লেনদেন কিছুটা বৃদ্ধি পায়। এখানে ৮ কোটি টাকা থেকে ১১ কোটিতে পৌঁছে লেনদেন।

এ দিকে সংশোধিত মার্জিন বিধিমালা ২০২৫ জনমত যাচাইয়ের জন্য কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিএসইসি জানিয়েছে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫-এর খসড়া সংশোধনীর ওপর সংশ্লিষ্ট সবার মতামত, পরামর্শ ও আপত্তি আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।

গতকাল বিএসইসি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

রোববার জাতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পাশাপাশি কমিশনের ওয়েবসাইটেও খসড়া সংশোধনী ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখ থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে কমিশনের কাছে মতামত, পরামর্শ অথবা আপত্তি পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সবাকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিএসইসি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ আইন ১৯৬৯ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩ অনুযায়ী যেকোনো বিধিমালা প্রণয়ন বা সংশোধনের ক্ষেত্রে অংশীজন ও সংশ্লিষ্ট সবার মতামত গ্রহণ একটি স্বাভাবিক ও বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া। সেই আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই খসড়া সংশোধনীটি জনমতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে।

কমিশন জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট সবার মতামত, পরামর্শ ও আপত্তিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে। প্রাপ্ত মতামত পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন বা পরিমার্জন শেষে বিধিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে এবং পরে সরকারি গেজেটে প্রকাশের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে।

বিএসইসি আরো জানিয়েছে, বর্তমানে প্রকাশিত খসড়া সংশোধনীটি একটি প্রস্তাবনা মাত্র, এটি কোনো চূড়ান্ত সংশোধনী নয়। ফলে খসড়া সংশোধনী সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের অনুমান, অপব্যাখ্যা বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে বিভ্রান্ত বা উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। কমিশনের ভাষ্য মতে, বিএসইসি সর্বদা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। প্রস্তাবিত সংশোধনীর লক্ষ্য হলো বিদ্যমান বিধিমালাকে আরো সহজ, বাস্তবসম্মত, ব্যবহারবান্ধব ও কার্যকর করা। অংশীজন ও সংশ্লিষ্ট সবার মতামত ও পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে বিধিমালার সংশোধনী চূড়ান্ত করা হবে, যা বিনিয়োগকারীবান্ধব হবে এবং বাজারের সার্বিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত হবে। কমিশন আশা প্রকাশ করেছে, সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজন গঠনমূলক মতামত প্রদান করবেন এবং গণমাধ্যম খসড়া সংশোধনী ও আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়টি যথাযথভাবে উপস্থাপনসহ গঠনমূলক সমালোচনা করবে, যাতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি বা উদ্বেগের সৃষ্টি না হয়।

এ দিকে গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল মালেক স্পিনিং। ৪৭ কোটি ১৬ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ১ কোটি ৩ লাখ ৩৫ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ৩৫ কোটি ৬৯ লাখ টাকায় ৭২ লাখ ৪৭ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে রসায়ন খাতের কোম্পানি ট্রেকনোড্রাগস উঠে আসে দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমেসামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, এসিআই ফরমুলেশন, ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেড, আইপিডিসি, এমএল ডাইং ও লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ।