রাউজানে থামছে না খুনের মিছিল

নেপথ্যে রাজনৈতিক আধিপত্য

আরফাত বিপ্লব, চট্টগ্রাম ব‍্যুরো

Location :

Raozan
Printed Edition
রাউজান থানা
রাউজান থানা |সংগৃহীত

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় থামছে না সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড। গত আট মাসে ১২টি খুনের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হাতে একের পর এক প্রাণ হারাচ্ছেন বিভিন্ন দলের কর্মী ও সাধারণ মানুষ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আসামিরা থাকছে অজ্ঞাত, কিংবা গ্রেফতার হলেও বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন, প্রভাবশালীদের চাপে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগও পুরনো।

গত ১৯ এপ্রিল রাতে উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের গরিব উল্লাহ পাড়ায় প্রতিবেশীর বাড়িতে রাতের খাবার খেতে বসা যুবদলকর্মী মানিক আবদুল্লাহকে (৩০) গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর দুই দিন পর, ২২ এপ্রিল দুপুরে রাউজান সদর ইউনিয়নের শমসের নগরের গাজীপাড়ায় প্রকাশ্য দিবালোকে চায়ের দোকানে গুলিতে প্রাণ হারান আরেক যুবদলকর্মী মুহাম্মদ ইব্রাহিম (৩০)। পরপর এই হত্যাকাণ্ডগুলো আবার আলোচনায় নিয়ে এসেছে রাউজানের ভীতিকর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে।

আট মাসে ১২ খুন, বিচার নিয়ে সংশয়

গত ৫ আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাউজানে রাজনৈতিক আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে সাথে সহিংসতা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই সময়ে ১২টি খুনের শিকার হয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাত নেতাকর্মী এবং এক ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন যুবদলের তিনজন (কমর উদ্দিন, ইব্রাহিম ও মানিক আবদুল্লাহ) এবং আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের চারজন (শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মান্নান, সাবেক এমপির বাগানবাড়ির কর্মচারী মুহাম্মদ ইউসুফ মিয়া, ওলামা লীগ সদস্য মাওলানা আবু তাহের ও যুবলীগকর্মী মুহাম্মদ হাসান)। এ ছাড়া গত ২৪ জানুয়ারি গুলিতে নিহত হন নোয়াপাড়ার ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম।

এই ১২টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৯টি মামলার এজাহারেই আসামিদের নাম ‘অজ্ঞাত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১০টি মামলায় পুলিশ এখনো কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর অভিযোগ, মামলা করার পর উল্টো আতঙ্কে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন তারা। মানিক আবদুল্লাহর স্ত্রী চেমন আরা মামলা দায়েরের পর সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়ি চলে গেছেন। একইভাবে ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রীও আসামিদের নাম উল্লেখ করে মামলা করার পর এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।

নিহত যুবদলকর্মী কমর উদ্দিনের বাবা মো: আলী মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ছেলেকে যারা খুন করেছে, তাদের কয়েকজন আমিরহাট বাজারে এসে ঘোরাঘুরি করে। পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারল না।’ মানিক আবদুল্লাহর বোন নাছিমা আক্তার বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা কোনো মামলা-মোকদ্দমায় নেই। কারা মারছে, তা আল্লাহ জানে। আল্লাহর হাতে বিচার ছেড়ে দিলাম।’

রাজনৈতিক চাপ ও পুলিশের ভূমিকা

অভিযোগ উঠেছে, খুনের ঘটনার তদন্তে পুলিশের উদাসীনতা রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আসামি ধরতে গেলেই রাজনৈতিক চাপে পড়তে হয়। বিশেষ করে স্থানীয় বিএনপির দুই শীর্ষ নেতার অনুসারীরাই বেশির ভাগ ঘটনার সাথে জড়িত বলে তাদের দাবি। এমনকি থানায় বসে কারা আসামি হবেন বা হবেন না, সেটাও তাদের প্রতিনিধিরা ঠিক করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও বিএনপির ওই দুই শীর্ষ নেতা গিয়াস কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খোন্দকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতির মুখে গত আট মাসে রাউজান থানায় তিন ওসি বদলি হয়েছে, কিন্তু পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। রাউজান থানার বর্তমান ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘প্রতিটি হত্যা পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে। জড়িতদের গ্রেফতারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ তিনি ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণকে রাউজানের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেন।

আধিপত্যের লড়াই ও দীর্ঘদিনের সঙ্ঘাত : রাউজানের সহিংসতা চার দশকের পুরনো। স্থানীয় বাসিন্দা, রাজনীতিবিদ ও পুলিশ সূত্রের ধারণা, এই দীর্ঘ সঙ্ঘাতে নিহতের সংখ্যা শতাধিক। আশির দশকে মূলত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবার ও আবদুল্লাহ আল হারুনের অনুসারীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যে রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতের শুরু, তা বিভিন্ন সময়ে রূপ পরিবর্তন করে এখনো চলমান।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর রাউজানের একক নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তৎকালীন সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর হাতে। গত বছরের জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থানে তার পতনের পর তিনি আত্মগোপনে যান এবং পরে গ্রেফতার হন। বর্তমানে তিনি কারাগারে। তার পতনের পর রাউজানের নিয়ন্ত্রণ নিতে বিএনপির দুই নেতা গিয়াস কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খন্দকারের মধ্যে নতুন করে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। নিহত যুবদলের তিনজনই গিয়াস কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

গিয়াস কাদের চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিচ্ছেন গোলাম আকবর খন্দকার। তারাই আমার অনুসারী বিএনপি নেতাকর্মীদের গুলি করে মারছে।’ অন্য দিকে গোলাম আকবর খন্দকার এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘রাউজানে যে খুনগুলো হচ্ছে, এগুলো অন্তর্দলীয় খুন। চাঁদাবাজির কারণে এসব হচ্ছে।’ এই দুই নেতাকে দলের শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতর থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেয়া হয়েছে। পাহাড়ি সীমান্ত এলাকা এবং কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী হওয়ায় রাউজানে ব্যবসা-বাণিজ্য, বালুমহাল, ইটভাটা এবং অবৈধ কাঠ ও মাদক চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় থাকে। এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাও সহিংসতা উসকে দেয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন অনেকে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি : রাউজানে বহু আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফখরুদ্দিন মো: বাবর ও রাউজান কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি মুজিবুর রহমান হত্যা, ১৯৯৩ সালে টিটু বিশ্বাস ও বিটু বিশ্বাস নামে দুই ভাই হত্যা এবং ১৯৯৯ সালে তৎকালীন উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি দিদারুল আলমকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় আসামিরা খালাস পেয়ে যান।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সভাপতি মো: সাখাওয়াত হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এগুলো খুবই উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যেন কোনো অপরাধী ছাড়া না পায়, সেটি নিশ্চিত করলেই কেবল অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।’

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা জামায়াতের আমির আলাউদ্দিন শিকদার নয়া দিগন্তকে বলেন, রাউজানের চলমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। পতিত সরকারের অস্ত্রধারীরা এখনো রয়ে গেছে। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি। এখন তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভেতরে আশ্রয় নিয়ে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড এবং অপরাধীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়া বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা আরো বাড়িয়ে তুলছে। এই সহিংসতা চক্র ভেঙে শান্তি ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনের নিরপেক্ষ কঠোর পদক্ষেপ জরুরি।