বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ রক্ষায় গতিহীন অভিযান আর অর্থহীন পরিকল্পনা

Printed Edition

আবুল কালাম

রাজধানীর চার পাশ দিয়ে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গা আর তুরাগ রক্ষায় কোনো অভিযানই কাজে আসছে না। ঢাকার প্রাণ এই দু’টি নদী রক্ষায় বছরের পর বছর পরিচালিত দূষণবিরোধী অভিযানগুলো কার্যত কোনো সুফল আনতে পারেনি। দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের পরও রক্ষা পায়নি এই দুই নদী। এগুলো রক্ষায় উচ্ছেদ-জরিমানা আর নতুন নতুন মহাপরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে সব কার্যক্রম। এমতাবস্থায় নদী বাঁচানোর এই আইনি ও প্রশাসনিক তৎপরতাগুলোকে এখন লোকদেখানো উদ্যোগ হিসেবেই দেখছেন পরিবেশবিদ ও সাধারণ মানুষেরা। এক দিকে সরকারি সংস্থাগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করে উচ্ছেদ করে, অন্য দিকে অদৃশ্য ইশারায় তা আবার দখল হয়ে যায়। ফলে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ রক্ষায় পরিচালিত অভিযান ও নানা পরিকল্পনা অর্থহীন হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে বসিলা, ওয়াশপুর, কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় শত শত বহুতল ভবন, দোকান ও অবৈধ ডকইয়ার্ড ভেঙে নদীর হাজার একর জমি উদ্ধারের কথা বললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই স্থানীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবশালীরা বাঁশ-কাঠ দিয়ে বা বালু ভরাট করে উদ্ধারকৃত জায়গা আবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। অন্য দিকে বিআইডব্লিউটিএর বিরুদ্ধে নদী তীরের অবৈধ দখল স্থায়ী করতে নদী রক্ষা কমিশন ও আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনার বাইরে গিয়ে মূল সিএস ম্যাপ অমান্য করে নদীর ভেতরের দিকে ভুল সীমানা পিলার দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে বড় বড় দখলদারেরা পার পেয়ে যাচ্ছে। অপর দিকে উচ্ছেদ করা জমিতে হাঁটার পথ বা ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হলেও অনেক জায়গায় সেগুলো এতই সরু এবং রক্ষণাবেক্ষণহীন যে সাধারণ মানুষ তা ব্যবহার করতে পারে না। উল্টো হকারদের বসার জায়গা ও ময়লা ফেলার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এতে করে উচ্ছেদ অভিযানে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও তার কোনো সুফল মিলছে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নদী দূষণ রোধে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বড় বড় পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বাস্তবে নাম মাত্র অভিযানের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ রয়েছে। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক শহরের খালের আদলে ঢাকার নদীগুলোকে সাজানোর প্রকল্প এখনো প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। এ ছাড়া কারখানাগুলোর ওপর নজরদারি বাড়াতে অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও ফাইলেই আটকে আছে। আর বুড়িগঙ্গা রক্ষায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রকল্পটিও অনুমোদনের অপেক্ষায় দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য, বিভিন্ন বাসাবাড়ির ময়লা সরাসরি নদীতে ফেলা এবং পলিথিনের কারণে নদীর পানি কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ও এর আশপাশের এলাকায় অসংখ্য ডাইং ও ওয়াশিং কারখানা, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত কারখানা (ডকইয়ার্ড) গড়ে উঠেছে। পরিবেশগত নিয়মনীতি না মেনে এসব অবৈধ স্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে নদী দূষণ করে আসছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রধানত তিন কারণে অভিযান ‘ফাইলবন্দী’ ও অকার্যকর হয়ে পড়ে। যার মধ্যে রয়েছে সমন্বয়ের চরম অভাব, ইটিপি ব্যবহার না করা, খোলা ড্রেন ও সুয়ারেজ লাইনের সংযোগ।

একাধিক সংস্থার গবেষণা ও পরিবেশ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, নদী ব্যবস্থাপনার সাথে ঢাকা ওয়াসা, পরিবেশ অধিদফতর, বিআইডব্লিউটিএ এবং সিটি করপোরেশন যুক্ত থাকলেও তাদের মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই। এক সংস্থা বর্জ্য লাইন বন্ধ করলে অন্য সংস্থা বা প্রভাবশালীরা তা পুনরায় চালু করে দেয়।

অন্য দিকে নদী তীরের টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানাগুলোতে তরল বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি থাকলেও খরচ বাঁচাতে বেশির ভাগ কারখানাই তা চালু রাখে না। ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করে আসার পর পরিস্থিতি আবার আগের মতোই রূপ নেয়। আর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন শত শত ড্রেন এবং সুয়ারেজ লাইন সরাসরি বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের সাথে যুক্ত, যেগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হলেও ঝুলে রয়েছে। এসব কারণে নদী দু’টির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। ভারী ধাতুর বিষাক্ততায় অক্সিজেনশূন্য পানিতে বিপন্ন নদীগুলোর জলজ প্রাণ। শুষ্ক মৌসুমে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। পানিতে অক্সিজেন না থাকায় কোনো মাছ বা জলজ প্রাণী এই নদীগুলোতে বেঁচে থাকতে পারছে না। কামরাঙ্গীরচর ও টঙ্গী শিল্পাঞ্চলের বর্জ্যের কারণে পানিতে সীসা, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মাত্রা আন্তর্জাতিক সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।

পরিবেশ অধিদফতরের একজন কর্মকর্তার মতে, বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চার পাশের নদ-নদী ও জলাশয় দূষণ রোধে পরিবেশ অধিদফতর নিয়মিত এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইতঃপূর্বে জাতীয় পরিবেশ নীতি-২০১৮ প্রণীত হয়েছে, যার মধ্যে নদ-নদী, প্লাবনভূমি, জলাভূমি ও বিভিন্ন ধরনের জলাশয়ের প্রতিবেশ ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে যুগোপযোগী নীতি নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিরাজমান পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের জীব বিজ্ঞান অনুষদ (মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগ) এর অধ্যাপক ড. সহিদ আকতার হুসাইন নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের জন্য ইন্ডাস্ট্রি যেমন প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিবেশ-প্রকৃতিকে রক্ষা করা। পরিবেশ দূষিত হলে মানুষসহ সব ধরনের প্রাণী-প্রকৃতি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। তাই নদী রক্ষা করেই সব ধরণের ইন্ডাস্ট্রি চালাতে হবে। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগকে বাঁচাতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু জরিমানা বা লোকদেখানো উচ্ছেদ নয় বরং দূষণের মূল উৎসগুলো চিরতরে বন্ধ করতে হবে এবং আইন অমান্যকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মো: লুৎফর রহমানের ভাষ্য, বুড়িগঙ্গায় পানিপ্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। নদীর পানি দূষণমুক্ত রাখতে ইটিপি ব্যবস্থা অনলাইন মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত কারখানার ক্ষতিকর বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে সেখানে সরাসরি কন্ট্রোলরুম স্থাপন করা হবে। তিনি বলেন, কারখানা থেকে নির্গত পানিতে বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক, রঙ, তেল, ভারী ধাতু এবং ক্ষতিকর পদার্থ থাকে। এই অপরিশোধিত পানি সরাসরি ড্রেন বা নদীতে গেলে পরিবেশ, জলজ প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইটিপি মূলত পরিবেশ দূষণ রোধ করতে এবং পানিকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করতে ব্যবহার করা হয়।