এম মাঈন উদ্দিন মিরসরাই (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের গহিন পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত মেলখুম গিরিপথে আবারো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। দুর্গম এই এলাকায় ভ্রমণে গিয়ে গত ৯ জুলাই বুধবার পাহাড় থেকে পড়ে মৃত্যু হয়েছে দুই তরুণের। আহত হয়েছেন আরো তিনজন।
দুর্গম ও বিপজ্জনক হওয়ায় ২০২৩ সাল থেকেই বন বিভাগ মেলখুমে প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সাইনবোর্ড, গণবিজ্ঞপ্তি ও সতর্কতামূলক ব্যানার লাগানো হলেও অনেকেই তা উপেক্ষা করে মেলখুমে প্রবেশ করছেন। অতি উৎসাহী হয়ে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই এই পাহাড়ি পথে পা রাখছেন, যার পরিণতিতে ঘটছে মৃত্যুর মতো ঘটনা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মেলখুম এলাকাটি সোনাপাহাড় নামে পরিচিত। এটা একটি গিরিপথ। এই গিরিপথে যেতে হলে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ঝিরিপথ ধরে হাঁটতে হয়। এরপর শুরু হয় প্রকৃতির রহস্যময় খেলা- উঁচু উঁচু পাহাড়, দুই পাশে পাথুরে দেয়াল, অল্প পানির মধ্যে হাঁটা, ওপর থেকে টুপটাপ ঝরেপড়া পানির ধারা আর মাঝেমধ্যে ছায়া-আলোর বিচিত্র দৃশ্য। পুরো পরিবেশটাই এক ধরনের গা ছমছম করা নিস্তব্ধ নীরবতা।
কিন্তু এই অভিজ্ঞতার পেছনে রয়েছে ভয়াবহ ঝুঁকি। পাহাড়ে ওঠানামার সময় প্রয়োজন হয় রোপ টেকনিক, দড়ি যথাযথ স্থানে আটকানোর বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ। মোটামুটি চার-পাঁচতলা বিল্ডিং সমান উচ্চতায় আপনাকে দড়ি বেয়ে নামার মতো দক্ষতা থাকতে হবে। পানিতে সাঁতার জানাও অত্যন্ত জরুরি। অনেক পর্যটক এই প্রস্তুতি ছাড়াই প্রবেশ করেন, যার কারণে প্রায়শই হতাহতের ঘটনা ঘটে।
২০২৩ সালের জুন মাসে মেলখুমে গিয়ে একাধিক পর্যটক পথ হারিয়ে ফেলেন। পরবর্তীতে আহত অবস্থায় তাদেরকে উদ্ধার করা হয়। ফায়ার সার্ভিস ও জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে তাদের উদ্ধার করে। এরপর থেকেই বন বিভাগ ওই এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করে এবং সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়। কিন্তু পাহাড়ের অন্য পথ ব্যবহার করে এখনো অনেকেই সেখানে যাচ্ছেন।
সর্বশেষ ঘটনায় নিহত দুই তরুণ উচ্চশিক্ষার্থী ছিলেন বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনার পর আহত তিন বন্ধুকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ফিরে আসা তিনজনের চোখে-মুখে ছিল আতঙ্কের ছাপ।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক হারুন অর রশিদ বলেন, ‘এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ট্রেইল। আমাদের বন কর্মীরাও সেখানে যেতে ভয় পান। কিন্তু তরুণরা অতি উৎসাহে ঝুঁকি নিচ্ছেন, প্রাণ হারাচ্ছেন। তাই বারবার নিষেধ করা হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সব পথ পাহারা দেয়া সম্ভব নয়। পরিবারের পক্ষ থেকে সচেতনতা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।’
স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘অপকার’এর নির্বাহী পরিচালক মো: আলমগীর বলেন, ‘এ ধরনের দুর্গম ভ্রমণের জন্য পর্যাপ্ত শারীরিক সক্ষমতা, রোপ টেকনিক, সাঁতার, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আবশ্যক। এসব না থাকলে এমন স্থানে যাওয়া মানেই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।’
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার বলেন, নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পর্যটকরা নিয়ম মানছেন না। প্রশিক্ষণ বা বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সচেতনতা ছাড়া আপাতত দুর্ঘটনা রোধের অন্য কোনো উপায় নেই।
প্রকৃতির অপার রহস্য ও সৌন্দর্য দেখতে গিয়ে যদি জীবনটাই হারাতে হয়, তবে সে আনন্দের কোনো মানে হয় না। তাই মেলখুমসহ অন্যান্য দুর্গম গন্তব্যে যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, অনুমতি ও সচেতনতা থাকা আবশ্যক। নয়তো বরাবরের মতো অযথাই ঘটে যেতে পারে মৃত্যুর মতো ঘটনা।



