ঢাবি প্রতিনিধি
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি। তিনি বলেন, জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাতিল করা হয়েছে এবং সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে কেবল সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক।
গতকাল বুধবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় ছাত্রশক্তি আয়োজিত ‘স্মরণগাথায় জুলাই : বিপ্লবের দিনগুলি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ছিলেন এনসিপির সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। বিশেষ আলোচক ছিলেন এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য এ নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন এবং এনসিপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক আলী আহসান জুনায়েদ।
এ ছাড়া বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান, সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি সালমান সিদ্দিকী প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাবি শাখার সভাপতি তাহমিদ আল মুদ্দাসিসর চৌধুরী।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ১৫ জুলাই একটি ঐতিহাসিক দিন। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সামনের সারিতে নারী শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের অবদান স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো কর্মসূচি নেই। প্রশাসন শুধু ৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অনুষ্ঠান চলাকালে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একই সময়ে টিএসসিতে ছাত্রদলের কর্মসূচিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত থাকায় সেখানে বিদ্যুৎ ছিল; কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচি হওয়ায় তাদের অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগণতান্ত্রিক চর্চার প্রতিফলন ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচিত সরকার হওয়ায় ভিসি নিয়োগসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত। ১৫ জুলাইয়ের হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার এবং আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শুধু মুখে জুলাইয়ের কথা বললে হবে না। এ দেশে রাজনীতি করতে হলে জুলাইয়ের রাজনীতি করতে হবে। জুলাইয়ের রাজনীতির বিপরীত হলো ফ্যাসিবাদী রাজনীতি।’ তিনি আরো বলেন, যারা গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে নেতিবাচক বক্তব্য দিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সবার, তাই এই বিপ্লবের চেতনা ধরে রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তাই জুলাইয়ের চেতনাও এই বিশ্ববিদ্যালয়কেই ধারণ করতে হবে।
প্রধান বক্তা আখতার হোসেন বলেন, আন্দোলনের কৌশলগত কারণে তিনি নেপথ্যে থেকে কাজ করেছিলেন। ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ছাত্রলীগের হামলার পরদিন আবু সাঈদসহ ছয়জন নিহত হন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগকে হল থেকে বের করে দেয় এবং পরদিন গায়েবানা জানাজার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। তিনি বলেন, ওই দিন পুলিশ তাকে ক্যাম্পাস থেকেই গ্রেফতার করে এবং প্রিজন ভ্যান থেকে তিনি জনগণকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘অনেক মানুষের রক্তের বিনিময়ে আমরা জুলাই পেয়েছি। সেই জুলাইকে নানা ভাবে অপমান করা হচ্ছে। কিন্তু যারা এই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছে, তাদের হৃদয় থেকে জুলাইকে কখনো মুছে ফেলা যাবে না।’
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দেশের মানুষের নাগরিক চেতনা জাগিয়ে তুলেছে এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশাকে আরো শক্তিশালী করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, সরকার পতনের আন্দোলনে ছাত্রদল দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিল। ১৫ জুলাইয়ের হামলার পর তারা প্রকাশ্যে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার দায়ে ছাত্রলীগের বাংলাদেশে রাজনীতি করার কোনো নৈতিক অধিকার নেই।
জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান বলেন, ২০২২ সালে আমরা টিএসসিতে একটা কাওয়ালী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। তখন ছাত্রলীগ বিদ্যুৎ বন্ধ করে আমাদের ওপর হামলা চালায়। আজ একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের প্রোগ্রামে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে করে তারা আমাদের কোনো ক্ষতি করেননি, বরং তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ক্ষতি করেছেন। আমরা বলেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে কোনো দলীয় লোক বসানো যাবে না। দলীয় লোক বসালে কী ক্ষতি হয় তা আমরা দেখেছি।
এ ছাড়া, অনুষ্ঠানে জাতীয় ছাত্রশক্তি আয়োজিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ওপর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।



