বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়কট হওয়া রাষ্ট্র ইসরাইল

Printed Edition

মিডল ইস্ট মনিটর

ইসরাইল বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি বয়কট বা বর্জনের মুখে পড়া দেশে পরিণত হয়েছে। দেশটির সরকারি কর্মকর্তা, দখলদার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার এক বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে বলে বৃহস্পতিবার ইসরাইলি দৈনিক ইয়েদিওথ আহরোনথ জানিয়েছে।

‘কিভাবে ইসরাইল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়স্কৃত রাষ্ট্রে পরিণত হলো’ শিরোনামের এক রিপোর্টে পত্রিকাটি জানায় যে, ইসরাইলি সরকারি কর্মকর্তা, দখলদার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার একটি সুনামি শুরু হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন দেশ এবং দীর্ঘ দিনের প্রো-বিডিএস সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ফ্রান্স সম্প্রতি ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচকে সেদেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর আগে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গ্যভীরের ওপরও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল প্যারিস।

পত্রিকাটির তথ্যমতে, পশ্চিম তীর দখল, নতুন বসতি স্থাপন এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করার নীতিতে এই দুই মন্ত্রীর ‘সক্রিয় উসকানি’র প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ফ্রান্স এই পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতিসঙ্ঘ পূর্ব জেরুসালেমসহ পশ্চিম তীরকে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড মনে করে এবং ইসরাইলের সাথে এর অন্তর্ভুক্তি আন্তর্জাতিক প্রস্তাব অনুযায়ী একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করবে।

গতিশীলতা বৃদ্ধি

ইয়েদিওথ আহরোনথ উল্লেখ করেছে যে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগ পর্যন্ত ইসরাইল বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা (বিডিএস) অভিযানের প্রভাব সীমিত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। সে সময় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ছিল খুবই সামান্য কারণ ইসরাইলের শক্তিশালী অর্থনীতির কারণে কেউ বিনিয়োগ প্রত্যাহার করতে চায়নি এবং অ্যাকাডেমিক ও সাংস্কৃতিক বয়কটগুলো ছিল মূলত প্রতীকী। তবে বর্তমানে এই পরিস্থিতি আরো তীব্র হয়েছে এবং বিডিএস আন্দোলন বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় সাফল্য পাচ্ছে বলে দৈনিকটি জানিয়েছে। এই আন্দোলন আন্তর্জাতিকভাবে ইসরাইলের ইমেজ মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ করেছে, যা বিভিন্ন জনমত জরিপে ইসরাইল সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা

ফ্রান্সের পক্ষ থেকে স্মোট্রিচ ও বেন-গ্যভীরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা উল্লেখ করে পত্রিকাটি জানায়, ইসরাইলি মন্ত্রীদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার ক্ষেত্রে প্যারিস এখন আয়ারল্যান্ড, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং নরওয়ের সাথে যোগ দিয়েছে। ফ্রান্স, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং নরওয়ে পশ্চিম তীরে সহিংসতা ছড়ানো দখলদার এবং সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ফ্রান্স চারজন অবৈধ বসতি স্থাপনকারী নেতা এবং ২১ জন দখলদারের প্রবেশাধিকার সীমিত করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য দখলদারদের হামলায় অর্থায়ন ও সহায়তা করা নেটওয়ার্কগুলোকে লক্ষ্য করে একটি কর্মপরিকল্পনা শুরু করেছে এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পশ্চিম তীরের বসতিতে কার্যক্রম না চালানোর আহ্বান জানিয়েছে।

কানাডা দুইজন নাগরিক এবং পাঁচটি সংস্থার ওপর প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া তিনজন নাগরিক এবং ছয়টি অবৈধ ঘাঁটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। নিউজিল্যান্ডও তিনজন ইসরাইলিকে নিষিদ্ধ করেছে এবং তাদের ৩৫ জনের একটি কালো তালিকায় যুক্ত করেছে, যার মধ্যে বেন-গ্যভীর, স্মোট্রিচ এবং দানিয়েলা ওয়েইস, জেভ হাবের, এলিশা ইয়ারেড, নোয়াম ফেডারম্যান, বারুচ মার্জেল ও বেনজি গোপস্টেইনের মতো অবৈধ বসতি স্থাপনকারী ব্যক্তিরা রয়েছেন। নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ফ্রান্স গাজাগামী ত্রাণ বহরের ঘটনার সাথে জড়িত নির্যাতন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে এবং ইতালিও ইতালীয় নাগরিকদের অবমাননা করার জন্য বেন-গ্যভীরের বিরুদ্ধে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নেও ইসরাইলি মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে আলোচনা চলছে। জার্মানি স্মোট্রিচের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার বিরোধিতা করলেও বেন-গ্যভীরের ওপর বিধিনিষেধকে সমর্থন করতে পারে বলে জানা গেছে, তবে চেক প্রজাতন্ত্রের ভেটোর কারণে এই পদক্ষেপ আটকে যেতে পারে।

পত্রিকাটির উদ্ধৃতি দিয়ে বিশ্লেষকরা বলেছেন, স্বল্প মেয়াদে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আসার সম্ভাবনা কম হলেও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বিবেচনাধীন থাকবে। তারা যুক্তি দেখিয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে, বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোকে একত্রিত করতে বা বয়কট আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ইহুদি সম্প্রদায়কে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।