শাহেদ মতিউর রহমান
দেশে কিংবা বিদেশে আমাদের শিক্ষা কাঠামোর সাথে শ্রমবাজারের কোনো মিল নেই। ফলে কর্মক্ষেত্রে চাহিদা থাকলেও সেই অনুপাতে দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত লোকের অভাব ব্যাপকভাবে বাড়ছে। যদিও দেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটছে দ্রুত। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন। কিন্তু সেই অনুপাতে হচ্ছে না কর্মসংস্থান। ফলে শিক্ষাজীবন শেষ করেও দীর্ঘ সময় চাকরির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে বিপুলসংখ্যক তরুণকে। অন্য দিকে শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ- প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী পাওয়া কঠিন। অর্থাৎ এক দিকে শিক্ষিত বেকারের সারি, অন্য দিকে দক্ষ জনবলের সঙ্কট- দুই বাস্তবতা একই সাথে চলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনেও এই বৈপরীত্য উঠে এসেছে। সম্প্র্রতি এক প্রতিবেদনে শ্রমবাজারের চাহিদা ও কর্মীর দক্ষতার অমিলকে ‘কাঠামোগত বেকারত্ব’-এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, দেশে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা প্রায় আট লাখ ৮৫ হাজার। তবে দেশের এই সঙ্কট নতুন করে তৈরি হয়নি। শিক্ষিত বেকারত্বের চিত্রটি দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক জরিপে বলা হয়, গত ১০ বছরে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই প্রতিবেদনে শ্রমবাজারে প্রায় ২৬ লাখ ২৮ হাজার কর্মক্ষম বেকারের কথা উল্লেখ করা হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানে চার লাখের বেশি পদ শূন্য থাকার বিষয়টিও সেখানে উঠে আসে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমবাজারে প্রতি বছর যে হারে মানুষ যুক্ত হচ্ছে, সে অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ চাকরির বাজারে প্রবেশ করেই দীর্ঘ প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। অন্য দিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কোন বিষয়ে কত শিক্ষার্থী পড়ছেন এবং অর্থনীতিতে কোন ধরনের দক্ষ জনবল প্রয়োজন- এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি সঙ্কটকে আরো বাড়িয়ে তুলছে।
কারিগরি শিক্ষায় পিছিয়ে বাংলাদেশ
শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে শিক্ষার সমন্বয় না থাকার বড় উদাহরণ কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মতে উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে মোট শিক্ষার্থীর ৭০ শতাংশের বেশি কারিগরি শিক্ষায় যুক্ত থাকলেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। এর ফলে উচ্চশিক্ষায় সাধারণ ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়লেও শিল্প, উৎপাদন, প্রযুক্তি, মেশিন পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, আধুনিক কৃষি কিংবা অন্যান্য দক্ষতাভিত্তিক খাতে প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি হচ্ছে তুলনামূলক কম। অন্য দিকে দেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ ২২ হাজার তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। জাতীয় বেকারত্বের হার ৩ শতাংশের কিছু বেশি হলেও শিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে সঙ্কটটি তুলনামূলকভাবে বেশি প্রকট।
চাকরিদাতা কিংবা উদ্যোক্তাদের মতে বেকারত্বের সমস্যাটির আরেকটি দিক হলো নিয়োগদাতাদের চাহিদা। শুধু সনদ বা ফলাফল নয়- ইংরেজি ভাষা, যোগাযোগ দক্ষতা, কম্পিউটার ও ডিজিটাল সক্ষমতা, সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতাকে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কোর্সে তাত্ত্বিক শিক্ষার ওপর জোর থাকলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর সংযোগ দুর্বল। ফলে শিক্ষার্থী জানেন তার বিষয়, কিন্তু জানেন না সেই জ্ঞান বাস্তবে কিভাবে প্রয়োগ করতে হয়। ফলে নতুন করে বেকারত্বের বড় কারণ হিসেবে দক্ষতার ঘাটতির বিষয়টিও জোরালোভাবে উঠে এসেছে।
সঙ্কটের পেছনে আরোকটি নতুন সমস্যা হলো কর্মসংস্থানের ধারণা। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এখনো সরকারি চাকরিকে নিরাপদ ও কাক্সিক্ষত কর্মজীবনের প্রধান পথ হিসেবে দেখেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি শেষ করার পরও অনেক তরুণ দীর্ঘ সময় ধরে বিসিএস, ব্যাংক, শিক্ষক নিবন্ধন কিংবা অন্যান্য সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতিতে থাকেন। এতে এক দিকে কর্মজীবনে প্রবেশ বিলম্বিত হয়, অন্য দিকে উদ্যোক্তা হওয়া, বেসরকারি খাতের দক্ষতা অর্জন কিংবা কারিগরি পেশায় প্রবেশের প্রবণতা কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে শুধু নতুন চাকরির বিজ্ঞপ্তি বাড়ালেই হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের আসন পরিকল্পনা করতে হবে শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে। কোন বিষয়ে আগামী পাঁচ বা দশ বছরে কত জনবল প্রয়োজন- তার পূর্বাভাস তৈরি করা জরুরি। একই সাথে উচ্চশিক্ষায় ইন্টার্নশিপ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা, ইংরেজি ভাষা, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ ও কর্মমুখী কোর্স বাধ্যতামূলক বা ব্যাপকভাবে চালু করা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- ডিগ্রি অর্জনকে শিক্ষার শেষ ধাপ না ভেবে কর্মদক্ষতা অর্জনের সাথে যুক্ত করা। কারণ বর্তমানে শ্রমবাজারে শুধু ‘শিক্ষিত’ মানুষ নয়, ‘কাজ জানে’- এমন মানুষই বেশি প্রয়োজন।



