হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ইরান-ওমান চুক্তি

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের রুট নিয়ে ওমানের সাথে একটি চুক্তি করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই এ তথ্য জানিয়েছেন। সূত্র : আনাদোলু এজেন্সি।

ইরানি সংবাদমাধ্যম দেফা প্রেসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বাকাই বলেন, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের পথের মানচিত্র নিয়ে ওমানের সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের বাধার মধ্যেও গত তিন সপ্তাহ ধরে এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল। তিনি বলেন, ‘গত তিন সপ্তাহের আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে এবং জাহাজ চলাচলের পথের মানচিত্র নিয়ে একটি চুক্তি হয়েছে।’

বাকাই জানান, চুক্তির খসড়া তৈরি ও স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেতৃত্ব দিয়েছে। আলোচনায় দেশটির প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও পরিবেশবিষয়ক কর্তৃপক্ষও অংশ নেয়। তবে এখনো ইরান বা ওমানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়া হয়নি। বাকাই বলেন, চুক্তির কয়েকটি বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়েছে। সেগুলো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। বিষয়গুলোর মীমাংসার পর চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালীর এক পাশে ইরান এবং অপর পাশে ওমান। ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরকে সংযুক্তকারী প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জলপথ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা জ্বালানি পণ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়।

এর আগে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। নিউ ইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইরানকে যুদ্ধে পরাজিত করার পর হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার কথা বিবেচনা করছেন তিনি। ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ওমানের সাথে চুক্তির কথা জানাল তেহরান।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ইরান ও ওমানের চুক্তিটি দুই উপকূলীয় রাষ্ট্রের মধ্যে একটি স্বাধীন সমঝোতা। এর লক্ষ্য দুই দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।

তবে চুক্তিটি কার্যকর হয়ে হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা, নৌ অবরোধ এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করছে বলে জানান বাকাই। তিনি আরো দাবি করেন, গত দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং দেশটির সামরিক হুমকি ও নৌ অবরোধের অবসানও এ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করলে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের প্রথম দিনেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিদেশী জাহাজ চলাচলে অবরোধ আরোপ করে ইরান। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে এপ্রিলে ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

পরে ১৭ জুন ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি হলেও জুলাইয়ে হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) হামলার পর পরিস্থিতির আবারো অবনতি ঘটে। এরপর দুই দেশই পরস্পরের ওপর নতুন করে অবরোধ ও বিধিনিষেধ আরোপ করে। এ অবস্থায় হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান-ওমানের নতুন চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক-সামরিকভাবে জয়ের দাবি

যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরান রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে জয় পেয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার বাকের গালিবাফ। গতকাল রোববার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এ যুদ্ধ কাপুরুষোচিত যুদ্ধ। যেটির বিরুদ্ধে ইরানের জনগণ সাহসিকতা, পৌরুষদীপ্তভাবে এবং আন্তরিকতার সাথে লড়াই করেছে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ৯টি লক্ষ্য ঠিক করেছিল। যার একটিও তারা অর্জন করতে পারেনি। আলজাজিরা জানায়, যুক্তরাষ্ট্র টানা ৪০ দিন যুদ্ধ করার পর ইরানের সাথে দুই মাসের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে। যেটি ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক হিসেবে পরিচিতি পায়। বাকের গালিবাফ বলেছেন, এই চুক্তিই ইরানের জন্য ‘সম্মান ও বিজয়ের দলিল’। যা ইরানের ক্ষমতাকে কূটনীতির মাধ্যমে আরো শক্তিশালী করেছে। তিনি বলেন, ‘এটির অর্থ এই নয় যে আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছি। এটির অর্থ হলো তারা আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছিল ৯টি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে। যার তারা আনুষ্ঠানিকভাবে, প্রকাশ্যে একাধিকবার ঘোষণা করেছে। কিন্তু তারা কোনো দিক দিয়েই একটি লক্ষ্যও অর্জন করতে পারেনি।’

মার্কিন সেনা হত্যা বা আটকের পুরস্কার ৩০ হাজার ডলার

যেকোনো মার্কিন সেনাসদস্যকে আটক বা হত্যা করতে পারলে ৩০ হাজার মার্কিন ডলার পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি। গতকাল রোববার এ তথ্য জানিয়েছে ইরানের সংবাদ সংস্থা ওয়ানা নিউজ এজেন্সি।

আমির হাতামি বলেন, কোনো ইরানি নাগরিক একজন মার্কিন সেনাসদস্যকে আটক বা হত্যা করতে পারলে তাকে ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার দেয়া হবে। এই অর্থ ‘ইরানের জনগণের পক্ষ থেকে’ দেয়া হবে বলেও জানান তিনি। এদিকে, এর আগেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার জন্য পুরস্কার ঘোষণার কথা জানিয়েছিলেন ইরানের কর্মকর্তারা। গত ১৫ মে ইরানের জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম আজিজি জানিয়েছিলেন, দেশটির পার্লামেন্টে প্রস্তাবিত একটি ব্যবস্থায় ট্রাম্পকে হত্যার জন্য ৫০ মিলিয়ন ইউরো পুরস্কারের কথা বলা হয়েছে। নতুন এই ঘোষণার ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালীর তদারকিতে বিল আনছে ইরান

বৈদেশিক প্রভাব মোকাবেলা এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালী তদারকির লক্ষ্যে দু’টি পৃথক বিল পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে ইরানের পার্লামেন্ট। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি এ তথ্য প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে আইনপ্রণেতাদের আলোচনার জন্য রোববার একটি ভার্চুয়াল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সদস্যরা হরমুজ প্রণালীর জন্য একটি ‘স্মার্ট ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ খতিয়ে দেখবেন।

পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনের লক্ষ্যে আনা আরেকটি বিলও পর্যালোচনা করবেন ইরানি আইনপ্রণেতারা।