নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি
সুপ্রিম কোর্ট বাণিজ্যনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বাতিল করে দেয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত নতুন শুল্ক কাঠামো গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। আদালত রায়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন (আইইইপিএ) ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পদক্ষেপ আইনসম্মত ছিল না। ৬-৩ ভোটের এ রায়ে আদালত উল্লেখ করে, ১৯৭৭ সালের আইইইপিএ আইন জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির প্রেক্ষিতে বাণিজ্য ‘নিয়ন্ত্রণ’-এর ক্ষমতা দিলেও শুল্ক নির্ধারণের ক্ষমতা দেয় না; সংবিধান অনুযায়ী এ ক্ষমতা কংগ্রেসের একচ্ছত্র অধিকার।
রায়টি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হলেও বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এটিকে গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিজয় মনে করছে। কারণ, তারা আরোপিত শুল্ক ফেরতের দাবি করতে পারে। তবে বিকল্প আইনি পথ ব্যবহার করে নতুন করে শুল্ক আরোপের যথেষ্ট ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে রয়েছে। সোমবার ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, কোনো দেশ যদি আদালতের এই সিদ্ধান্তকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে, বিশেষ করে যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘদিন ‘ঠকিয়েছে’, তাদের আরো কঠোর শুল্কের মুখে পড়তে হবে।
গত বছর ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প আইইইপিএ ব্যবহার করে কানাডা, মেক্সিকো ও চীনের ওপর শুল্ক আরোপ করেন। তার দাবি ছিল, এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল পাচার ঠেকাতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। পরে ‘লিবারেশন ডে’ ঘোষণায় আরো বহু দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করা হলেও বাজার অস্থিরতা ও আলোচনার প্রেক্ষাপটে কিছু শুল্ক কমানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, হোয়াইট হাউজ আগেই নেতিবাচক রায়ের সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখেছিল। কেপিএমজি ইউএস-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ডায়ান স্বংক এক বিশ্লেষণে বলেন, অবৈধ ঘোষিত শুল্ক অন্য আইনি পথ ব্যবহার করে দ্রুত পুনর্বহাল করা সম্ভব- এ জন্য প্রস্তুতিও নেয়া ছিল।
এরই অংশ হিসেবে ট্রাম্প ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২ ব্যবহার করে ১০ শতাংশ সার্বজনীন শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেন। এই ধারায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য সমস্যার সমাধানে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক ১৫০ দিনের জন্য আরোপ করা যায়। পরে তিনি এ হার ১৫ শতাংশে উন্নীত করার হুমকিও দেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে প্রকৃতপক্ষে এমন ভারসাম্য সমস্যা আছে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
এ ছাড়া প্রশাসন ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় নতুন শুল্ক আরোপের প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানিয়েছে। এ ধারায় ‘অন্যায্য বাণিজ্য আচরণ’-এর প্রতিক্রিয়ায় শুল্ক আরোপের ক্ষমতা রয়েছে। প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর এই ধারায় শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা পরবর্তী প্রশাসনও বহাল রাখে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো এডওয়ার্ড অ্যালডেন বলেন, সেকশন ৩০১-এর দীর্ঘ আইনি ইতিহাস থাকায় আদালতে চ্যালেঞ্জ হলেও এ ধরনের শুল্ক টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি।
পাশাপাশি ১৯৬২ সালের ট্রেড এক্সপ্যানশন অ্যাক্টের সেকশন ২৩২ ব্যবহার করে জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির যুক্তিতে নতুন শুল্ক আরোপের সুযোগও রয়েছে। প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর এ ধারায় শুল্ক আরোপ করেন। দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি গাড়ি, গাড়ির যন্ত্রাংশ, কাঠসহ আরো কয়েকটি পণ্যে এই শুল্ক সম্প্রসারণের পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প তার আমদানি কর কাঠামো পুনর্গঠন করতে সক্ষম হতে পারেন। তবে সুপ্রিম কোর্টের রায় ও এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের এক গবেষণা নোটে বলা হয়েছে, নতুন শুল্ক কাঠামো বাণিজ্য অংশীদারদের সাথে উত্তেজনা বাড়াতে পারে এবং বাণিজ্যপ্রবাহে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে কম শুল্কের দেশ থেকে আমদানি বাড়া এবং বেশি শুল্কের দেশ থেকে আমদানি কমার সম্ভাবনা রয়েছে।



