মনিরুজ্জামান সুমন দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)
চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে যেন এক অদৃশ্য স্বর্ণ করিডোর। চলে একের পর এক অভিযান, ধরা পড়ে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ। আট হয় বাহকরা। কিন্তু অধরাই থেকে যায় মূল হোতারা। আড়ালেই থেকে যায় সেই চক্র, যারা পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে শুধু বাহক গ্রেফতারেই কি বন্ধ হবে স্বর্ণ চোরাচালান? পর্দার আড়ালের মূল হোতারা কি ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে? আর এভাবেই চলতে থাকবে এই অবৈধ বাণিজ্য?
ভারত সীমান্তঘেষা দর্শনা, দামুড়হুদা ও জীবননগর এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ স্বর্ণ চোরাচালান রুট হিসেবে পরিচিত। সীমান্তজুড়ে বিজিবির কঠোর নজরদারি, গোয়েন্দা অভিযান ও ধারাবাহিক সফলতা সত্ত্বেও একই রুটে বারবার স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে এসব প্রশ্নই দেখা দিচ্ছে জনগণের মনে।
সর্বশেষ গত শনিবার দর্শনা পারকৃষ্ণপুর সীমান্তে অভিযান চালিয়ে ৬ বিজিবি ৩৯টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে, যার মোট ওজন ছয় কেজি ৯৬৮ গ্রাম এবং আনুমানিক বাজারমূল্য ১৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ঘটনায় একজন বাহককে আটক করা হয়। এর আগে গত ১৫ জুলাই মুন্সিপুর সীমান্ত থেকে আটটি স্বর্ণের বার (মূল্য প্রায় এক কোটি ৭৬ লাখ টাকা) উদ্ধার হয়। গত ২৪ মে দামুড়হুদার ডুগডুগি এলাকা থেকে পাঁচটি স্বর্ণের বার (প্রায় ৬০০ গ্রাম, মূল্য এক কোটি ২১ লাখ টাকা) জব্দ করা হয়। ১৩ এপ্রিল দর্শনা পুরাতন রেলস্টেশন এলাকা থেকে ১০টি স্বর্ণের বার (যার ওজন প্রায় ১.১৬৬ কেজি এবং বাজার মূল্য প্রায় দুই কোটি ৪৭ লাখ টাকা) উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরও আগে ২০২৫ সালের ৪ মার্চ একটি যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি চালিয়ে ১৮টি স্বর্ণের বার জব্দ করা হয়। যার ওজন ২.৪১১ কেজি এবং বাজার মূল্য প্রায় দুই কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
এগুলো কেবল সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা মাত্র। অতীতের রেকর্ড আরো বিস্ময়কর। ২০১৮ সালে মাত্র তিন মাসে দামুড়হুদা সীমান্ত থেকে ৩৭৮টি স্বর্ণের বার, যার ওজন ৪৫.২৯ কেজি, উদ্ধার করা হয়েছিল। সেটি ছিল তখনকার সময় দেশের অন্যতম বড় স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা।
প্রতিটি অভিযানের পর সংবাদ সম্মেলন, প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও মামলার খবর প্রকাশ হলেও এরপর কি হয়, তার আর কোনো হদিস থাকে না। অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাহক বা পরিবহনকারী গ্রেফতার হলেও তদন্তের শেষ পর্যায়ে গিয়ে মূল অর্থদাতা বা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সদস্যদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আর কোনো পদক্ষেপ প্রকাশ্যে আসে না। সব যেন ধামাচাপা পড়ে যায়।
সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্লেষণেও ওঠে এসেছে যশোর, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ জব্দ হলেও অধিকাংশ মামলায় অভিযোগপত্র সীমাবদ্ধ থেকেছে বাহকদের মধ্যেই। ফলে নেপথ্যের চক্র শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ থেকেই যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, স্বর্ণ চোরাচালান সাধারণত কয়েকটি ধাপে পরিচালিত হয়। প্রথমে থাকে অর্থদাতা ও সংগ্রহকারী, এরপর পরিবহন সমন্বয়কারী, তারপর সীমান্ত পারাপারের বাহক এবং সর্বশেষ ওপারে গ্রহণকারী।
সীমান্তে যাদের আটক করা হয়, তারা অনেক সময় নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে শুধু বহনের কাজটিই করেন। ফলে তাদের কাছ থেকে পুরো চক্রের তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আর এই সুযোগেই নেপথ্যের মূল হোতারা আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং স্বর্ণসহ সব ধরনের আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান প্রতিরোধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। সর্বশেষ গত ১ আগস্টের সফল অভিযানের পর বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্তে চোরাচালান নির্মূলে তাদের অভিযান আরো জোরদার করা হবে।
চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে একের পর এক স্বর্ণ উদ্ধার নিঃসন্দেহে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাফল্য। তবে একই রুটে বারবার একই ধরনের চালান ধরা পড়ার ঘটনা আরেকটি বাস্তবতাকে সামনে এনে দেয়, বাহক বদলালেও সিন্ডিকেট কি একই রয়ে যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে তখনই, যখন স্বর্ণের চালান বহনকারীদের পাশাপাশি তদন্তের মাধ্যমে নেপথ্যের অর্থদাতা, চক্র ও পুরো চোরাচালান নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। ততদিন পর্যন্ত সীমান্তে স্বর্ণ উদ্ধারের খবর হয়তো আসবে, কিন্তু চোরাচালানের মূল শিকড় অক্ষতই থেকে যাবে।
দামুড়হুদা-জীবননগর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার শেখ মো: নুর উল্লাহ বলেন, আটক ব্যক্তিরা বেশির ভাগই বহনকারী। তারা অনেক সময় মূল হোতাদের পরিচয়ও জানে না। চোরাচালান কয়েকটি স্তর অতিক্রম করে পরিচালিত হওয়ায় মূল আসামিদের শনাক্ত করতে তদন্তে জটিলতা সৃষ্টি হয়। তবে তাদের শনাক্তে তদন্ত চলমান থাকবে।
চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ও পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান বলেন, বিজিবির দায়িত্ব সীমান্তে অভিযান চালিয়ে স্বর্ণসহ জড়িত ব্যক্তিদের আটক করে থানায় হস্তান্তর করা। এরপর মামলার তদন্ত ও মূল হোতাদের শনাক্ত করার দায়িত্ব পুলিশেরই।



