কূটনৈতিক প্রতিবেদক
মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি
বাংলাদেশের কক্সবাজার ও ভাসানচরের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেয়া সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের দেয়া আট লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন বাস্তুচ্যুত ব্যক্তির তালিকার মধ্যে মিয়ানমার ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত চার লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনকে যাচাই করেছে। যাচাইকৃতদের মধ্যে তিন লাখ আট হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করা গেছে। এর মধ্যে চার হাজার ২৪১ জন সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত। এক লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা যায়নি। রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো স্থিতিশীল হলে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে মিয়ানমার যাচাইকৃত বাস্তুচ্যুতদের গ্রহণ করবে।
গতকাল মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে এবং ২০১৭ সালের আগস্টে আরসা (আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি) সন্ত্রাসী গোষ্ঠী উত্তর রাখাইন রাজ্যের পুলিশ ফাঁড়ি ও ব্যাটালিয়নগুলোর ওপর একযোগে ও সমন্বিত হামলা চালায়। এ ছাড়া সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি সরকারি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের হত্যা করে। আত্মরক্ষার্থে তাতমাদাওকে (মিয়ানমার সেনাবাহিনী) সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছিল। আরসা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হুমকি ও হামলার ফলে স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা অন্যান্য শহর ও গ্রামে পালিয়ে যায় এবং বিপুলসংখ্যক বাঙালি বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
রেকর্ড অনুযায়ী, আরসার সন্ত্রাসী হামলার আগে রাখাইন রাজ্যের বুথিডং, মংডো এবং রাথেডং টাউনশিপে সাত লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি বাঙালি বসবাস করতেন। এই ঘটনার পর এলাকাগুলোতে দুই লাখের বেশি বাঙালি থেকে যান এবং পাঁচ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি বাঙালি বাংলাদেশে পালিয়ে যান। এ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে রাখাইন রাজ্য থেকে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত ব্যক্তির যে বিবরণ দেয়া হয়, তা সঠিক নয় বলে প্রমাণিত হয়েছে। বাস্তুচ্যুতদের প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে মিয়ানমার দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশের সাথে তিনটি দ্বিপক্ষীয চুক্তি সই করে। এই চুক্তিগুলো অনুসারে, মিয়ানমার তিনবার বাস্তুচ্যুতদের গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিরা মিয়ানমারে ফিরে আসেননি।
বাংলাদেশে অবস্থিত শিবিরগুলোতে বসবাসকারী সব ব্যক্তি মিয়ানমারের নাগরিক- এই অভিযোগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মিয়ানমার দ্ব্যর্থহীনভাবে এই বক্তব্য ও অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে যে, ‘বোট পিপল’ এবং অন্যান্য দেশে যাওয়া ব্যক্তিরা মিয়ানমারে অস্তিত্বহীন একটি জাতিগত পরিচয়ের মিথ্যা দাবি করে। ১৯৭৮, ১৯৯১ এবং ১৯৯২ সালে পরিচালিত অভিবাসন যাচাইয়ের কারণে রাখাইন রাজ্য থেকে কিছু বাঙালি বাংলাদেশে পালিয়ে যান। তবে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার ১৯৭৮ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে সফলভাবে এক লাখ ৮৬ হাজার ৯৬৮ জন এবং ১৯৯২ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে দুই লাখ ৩৬ হাজার ৪৯৫ জন বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিকে গ্রহণ করেছিল।
এতে বলা হয়, সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোভাবের চেতনায় যাচাইকৃত বাস্তুচ্যুতদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের সুবিধার্থে মিয়ানমার বাংলাদেশের সাথে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। বাস্তুচ্যুতদের প্রত্যাবাসন দুই দেশের মধ্যে সমাধানযোগ্য একটি বিষয়। তাই এই বিষয়টিকে একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে ভুলভাবে চিত্রিত করায় মিয়ানমার গভীরভাবে অসন্তুষ্ট।
বাস্তুচ্যুতদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার বন্ধু দেশগুলোর সাথে গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।



