রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন ও দূরত্ব বাড়লেও ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বাস্তবতা ভিন্ন। এক দিকে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি ধরে রাখার চেষ্টা। অন্য দিকে শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যে ভারতের ওপর বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতা আরো স্পষ্ট হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের বাণিজ্য বাড়লেও ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে না; বরং বড় হচ্ছে বাণিজ্য ঘাটতি। রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তনের এই সময়ে দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভর বাণিজ্য কাঠামো বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সরবরাহব্যবস্থার জন্য নতুন কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তারা বলছেন, রাজনৈতিক সম্পর্কে দূরত্ব বাড়ছে, কূটনৈতিক অস্বস্তিও কাটছে না। সীমান্ত বাণিজ্য, পণ্য পরিবহন, ট্রান্সশিপমেন্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। অথচ অর্থনীতির বাস্তবতা যেন ভিন্ন গল্প বলছে। রাজনৈতিক সম্পর্কের শীতলতার মধ্যেও ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের রফতানি বাড়ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভারতে বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছে ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বাজারে ৩৩৫ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩১১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রফতানি বেড়েছে প্রায় ২৩ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিকভাবে দূরে সরে যাওয়ার পরও ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি কেন বাড়ছে। এর উত্তর শুধু কূটনীতিতে খুঁজলে মিলবে না। বরং এর পেছনে কাজ করছে ভৌগোলিক নৈকট্য, বড় ভোক্তা বাজার, পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, বিদ্যমান সরবরাহব্যবস্থা এবং দুই দেশের শিল্পের পারস্পরিক নির্ভরতা। তবে এই রফতানি প্রবৃদ্ধির আড়ালে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে- বাংলাদেশের শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থা এখনো ভারতের অনেক কাঁচামাল, সুতা, তুলা, কাপড়, শিল্প উপকরণ ও অন্যান্য পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। এমন পরিস্থিতিতে এক দিকে ভারত বাংলাদেশের জন্য বড় রফতানি বাজার, অন্য দিকে ভারতের ওপর বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতা আরো বড়। এখানেই তৈরি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ঝুঁকি।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ রফতানি ছিল ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ পুরো অর্থবছরে রফতানি প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আবার প্রবৃদ্ধির ধারা দেখা দিয়েছে। বিপরীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি আরো বড় হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য ভারতের বাজার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ভারতের পণ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই অসম বাণিজ্য সম্পর্কই রাজনৈতিক দূরত্বের সময় সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ দিকে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ দেশটির বিশাল ভোক্তা বাজার। ১৪০ কোটির বেশি মানুষের ভারতের বাজারে বাংলাদেশী পোশাক, জুতা, পাট ও পাটজাত পণ্য, মাছ, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা রয়েছে। ২০২৫ সালের ভারতীয় আমদানি তথ্যেও বাংলাদেশ থেকে পোশাক, পাটজাত পণ্য, জুতা, মাছ ও খাদ্যপণ্যের উল্লেখযোগ্য আমদানির চিত্র পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, পোশাক খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা ভারতের বাজারে একটি বাড়তি সুবিধা তৈরি করেছে। বাংলাদেশে উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় ভারতের কিছু ক্রেতার কাছে বাংলাদেশী তৈরী পোশাক আকর্ষণীয়। একই সাথে ভারতের বড় শহর ও মধ্যবিত্ত ভোক্তা শ্রেণীর সম্প্রসারণও আমদানির চাহিদা তৈরি করছে। তবে শুধু বাজারের চাহিদা দিয়ে বর্তমান রফতানি প্রবৃদ্ধিকে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদনের সাথে ভারতের সরবরাহব্যবস্থার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে তৈরী পোশাক খাতের জন্য তুলা, সুতা, কাপড় ও বিভিন্ন শিল্প উপকরণের একটি বড় অংশ ভারত থেকে আসে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের ভারতমুখী রফতানিতে টেক্সটাইল, খাদ্য ও পানীয়সহ বিভিন্ন খাতে বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলের সংযোগ রয়েছে এবং ভারতের সাথে বাণিজ্যে বাংলাদেশ বিদেশী মূল্য সংযোজনকারী উপকরণের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভর করে। অর্থাৎ বাংলাদেশের রফতানি ভারতের বাজারে প্রবেশ করছে; কিন্তু সেই রফতানি উৎপাদনের পেছনেও ভারতীয় কাঁচামাল ও উপকরণের ভূমিকা রয়েছে।
তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত বাংলাদেশী পণ্য তৃতীয় দেশে পাঠানোর জন্য ব্যবহৃত ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধাও প্রত্যাহার করে। এর ফলে ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়াসহ বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশী পণ্য পাঠানোর লজিস্টিক ব্যয় ও সময় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবু এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশের ভারতমুখী রফতানি পুরোপুরি থামাতে পারেনি। বরং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের রফতানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল বলে ভারতের মনিপাল ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ দিকে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীও সম্প্রতি বলেছেন, অর্থনৈতিক স্বার্থ রাজনীতির আগে এগিয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত রাজনীতিও তার অনুসরণ করে। তার বক্তব্যের মধ্যে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা ফুটে ওঠে- অর্থনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় কূটনৈতিক দূরত্বকে অতিক্রম করতে পারে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়লেও বাণিজ্য ভারসাম্য বাংলাদেশের অনুকূলে নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে ১০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানির বিপরীতে রফতানি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য মূলত কূটনীতির চেয়ে কাঠামোগত অর্থনৈতিক প্রয়োজনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের রফতানিমুখী শিল্পের জন্য ভারতীয় কাঁচামাল গুরুত্বপূর্ণ এবং দুই দেশের অর্থনীতি দীর্ঘ দিন ধরে একটি সরবরাহশৃঙ্খলে যুক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামার সাথে বাণিজ্য সম্পর্ককে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং কূটনৈতিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা যতটা জরুরি, ততটাই জরুরি অর্থনৈতিক সম্পর্ককে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন. চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য উৎস থেকে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বাড়ানো, স্থানীয় শিল্পে কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা এবং বিকল্প লজিস্টিক রুট গড়ে তোলা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অশুল্ক বাধা, স্থলবন্দর বিধিনিষেধ, ট্রান্সশিপমেন্ট ও বাজার প্রবেশের বিষয়গুলোকে বাণিজ্যিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।
দেশের রফতানি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ছে- এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক খবর। কিন্তু একই সাথে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের আমদানি যখন কয়েক গুণ বেশি, তখন শুধু রফতানি প্রবৃদ্ধিকে সাফল্যের সূচক হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা আড়ালে পড়ে যাবে। রফতানি বাড়ার পাশাপাশি যদি কাঁচামাল, শিল্প উপকরণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যে ভারতের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে, তাহলে বাণিজ্য সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে বলে তারা মনে করছেন।



