সংসদ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের ৫৪ বছরের সংসদীয় ইতিহাসে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে দাবি করেছেন সরকারিদলের চিফ হুইপ মো: নূরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো বাজেটে বিরোধীদল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে এবং সরকার ও বিরোধীদল একসাথে দেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, প্রতি বছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়েছে। এই অর্থপাচার বন্ধ করা এবং দুর্নীতি কমানো গেলে বাজেট বাস্তবায়নে অর্থসঙ্কট থাকবে না।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, এটি তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রণীত প্রথম বাজেট এবং সংসদীয় চর্চার ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী নজির সৃষ্টি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী বিরোধীদলের জন্য ২৬ শতাংশ সময় বরাদ্দ থাকলেও তাদের অতিরিক্ত সময় দেয়া হয়। ফলে তারা প্রায় ৩১ শতাংশ সময় বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছেন। বিরোধীদলের নেতারা ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট পর্যন্ত বক্তব্য দিয়েছেন এবং বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের ক্ষেত্রেও কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
চিফ হুইপ বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এই প্রথম বিরোধীদলীয় নেতা নিজেই স্পিকারের কাছে গিলোটিন প্রস্তাব আনার অনুরোধ করেছেন। একই সাথে বিরোধীদল ছাঁটাই প্রস্তাবও প্রত্যাহার করে নেয়, যা প্রমাণ করে বাজেট নিয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে বলে তারা মনে করেছে।
তিনি জানান, সাইকেল পার্টসের ওপর কর ছাড়ের দাবি ছাড়া বিরোধীদলের অন্য কোনো দাবি ছিল না। ওই দাবিও প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছেন। এসব পদক্ষেপ সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে দেশ গঠনের বিষয়ে ইতিবাচক সহযোগিতার মনোভাবের প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চিফ হুইপ বলেন, অতীতের মতো এবার বাজেটকে কেন্দ্র করে মিছিল-মিটিং, বর্জন বা তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতার ঘটনা ঘটেনি। একই সাথে বাজেট ঘোষণার আগে কিংবা পাস হওয়ার পরও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হয়নি।
তিনি বলেন, সরকার চায় কর কমানোর সুফল সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাক। ৬৩টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কোনো কর বাড়ানো হয়নি; বরং যেসব পণ্যে ৫ শতাংশ কর ছিল, তা কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম কমা উচিত।
বাজেটকে ‘জীবনবান্ধব’ উল্লেখ করে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, মানুষের জীবন ও জীবিকার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রায় সব খাতই এ বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রী এটিকে বাস্তব অর্থেই জীবনবান্ধব বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, প্রতি বছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়েছে। এই অর্থপাচার বন্ধ করা এবং দুর্নীতি কমানো গেলে বাজেট বাস্তবায়নে অর্থসঙ্কট থাকবে না।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সঙ্কট এবং অতীতের আর্থিক অনিয়মের প্রভাব এখনো বিদ্যমান। এ কারণে সরকার শুধু অবকাঠামো নয়, দীর্ঘমেয়াদি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
চিফ হুইপ বলেন, পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষিতে পানির নিশ্চয়তা এবং দেশের পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২৫ কোটি গাছ রোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন, কৃষক কার্ড, পরিবার কার্ড, নারীদের জন্য বিশেষ কার্ড, প্রবাসীসেবা এবং স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং কাউকে খাদ্যাভাবের মধ্যে না রাখা।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। যাচাই-বাছাই করে তথ্য প্রকাশ এবং মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর আস্থা রাখারও আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটানো তরুণ প্রজন্ম দেশের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তাই দেশবিরোধী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারি দলের হুইপ অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু উপস্থিত ছিলেন।



