সরকারের কাছে ৮ দাবি জুলাই ঐক্যের

আওয়ামী লীগের দোসর ৪৪ আমলার তালিকা প্রকাশ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

আওয়ামী লীগপন্থী আমলাদের পুনর্বাসন ঠেকাতে সচিবালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে ৮০টি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন সমন্বয়ে গঠিত প্ল্যাটফর্ম ‘জুলাই ঐক্য’। এ সময় প্ল্যাটফর্মটি সরকারের কাছে ৮ দফা দাবি পেশ করে। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্ল্যাটফর্মটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ মুহতাসির রহমান আলিফের বাবা মোহাম্মদ গাজীউর রহমান তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের নাম পাঠ করে শোনান।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন, জুলাই ঐক্যের সংগঠক এবি জুবায়ের। তিনি বলেন, সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে যে গ্যাজেট প্রকাশ করেছে সে অনুযায়ী আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম এবং ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ সরকার নেয়নি। গ্যাজেট অনুযায়ী ১৪ দলের শরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। জুলাই আগস্টে শুধু নয় গত সাড়ে ১৫ বছর সচিবালয়ের আমলা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা যেভাবে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করেছিল তারা এখনো সচিবালয়সহ বিভিন্ন স্থান নিয়ন্ত্রণ করছে। ২ হাজার প্রাণ ও ৩১ হাজার আহত ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে আমরা গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার পেলেও আমাদের ব্যর্থতা বিপ্লবী সরকার গঠন করতে না পারা। যে সুযোগটি নিয়েছে আওয়ামী লীগের দোসররা। দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনে সহযোগিতা করছে কিছু আমলা ও প্রশাসনে থাকা কর্মকর্তারা।

তিনি আরো বলেন, আমরা দেখেছি একদিন আগেও ঢাকার একাধিক স্থানে মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। প্রশাসন যদি সরব বা সতর্ক থাকত তাহলে তারা এই মিছিল করতে সাহস পেত না। এখনো আওয়ামী লীগের অনেক এমপি-মন্ত্রী দেশে আছে। সরকারের সেই আমলারাই তাদের সেফ এক্সিট দিচ্ছে। সর্বশেষ আব্দুল হামিদ তার প্রমাণ। আমরা অনেক ধৈর্য ধারণ করেছি। আমরা দেখছি জুলাইয়ের শক্তিগুলোকে কীভাবে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। আমরা জুলাই ধারণ করে এখন পর্যন্ত বেঁচে আছি। আমাদের বেঁচে থাকার একটাই উদ্দেশ্য জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখা। জুলাই না বাঁচলে আমরাও বাঁচবো না। এই প্রতিজ্ঞা নিয়েই জুলাইয়ের শক্তিদের নিয়ে আমাদের জুলাই ঐক্য। আমরা আজকে (গতকাল) সচিবালয়সহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং জুলাই আগস্টের আন্দোলনের সময় যেসব ম্যাজিস্ট্রেট ছাত্র-জনতার বুকে গুলি করে রক্তাক্ত করেছে তাদের আংশিক তালিকা প্রকাশ করেছি। এটা প্রাথমিক তালিকা। আমরা খুব শিগগিরই আমাদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সব সেক্টরে থাকা স্বৈরাচারের দোসরদের তালিকা প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কালচারাল ফ্যাসিস্ট, শিক্ষাঙ্গন, চিকিৎসাঙ্গন, আইনাঙ্গন এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সেক্টরে থাকা স্বৈরাচারের দোসরদের তালিকা প্রকাশ।

তালিকায় থাকা ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আমলারা হলেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমূল আহসান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফারহানা আহমেদ, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: এমদাদুল্লাহ মিয়া, ভূমি আপিল বোর্ডের সচিব মো: ইব্রাহিম, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো: নাজমা মোবারেক, ডাক ও টেলি যোগাযোগ বিভাগের সচিব মো: মুশফিকুর রহমান, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব মো: আবদুর রহমান খান, অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো: খায়রুজ্জামান মজুমদার, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন সদস্য মো: রুহুল আমিন, দুর্নীতি দমন কমিশন সচিব খোরশেদা ইয়াসমীন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন চেয়ারম্যান মো: আমিনুল আহসান, বিপিএটিসি রেক্টর সচিব সাঈদ মাহবুব খান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো: মোকাব্বের। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো: সাহদুর রহমান, জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমির রেক্টর (সচিব) ড. মো: শহিদুল্লাহ, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমির রেক্টর (সচিব) ড. মো: ওমর ফারুক, শ্রম মন্ত্রণালয়ের সচিব, এ এইচ এম শফিকুজ্জামান, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) নাসরিন আফরোজ, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (চুক্তিভিত্তিক) মোহাম্মদ জয়নুল বারী, সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান (চুক্তিভিত্তিক) মো: মুসলিম চৌধুরী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: আশরাফ উদ্দিন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইশরাত চৌধুরী। বিশ্ব ব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক (সচিব) শরিফা খান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়ের, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব ডা: মো: সারোয়ার বারী, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার), জাহেদা পারভীন, ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী, প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) এ এম আকমল হোসেন আজান, প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য, ইকবাল আব্দুল্লাহ হারুন, জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক (সচিব) সুকেশ কুমার সরকার, মহিলা ও শিশুবিষয়ক সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সংযুক্ত সচিব মোহাম্মদ মাহমুদুল হোসাইন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সাইদুর রহমান, যুব উন্নয়ন অধিদফতরের মহাপরিচালক (গ্রেড-১) গাজী মহম্মদ সাইফুজ্জামান, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান (গ্রেড-১) ডক্টর লিপিকা ভদ্র, জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (গ্রেড-১) মো: আব্দুল কাইয়ুম, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে চুক্তিভিত্তিক মহাপরিচালক (গ্রেড-১) সালেহ আহমেদ মোজাফফর, মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের মহাপরিচালক (গ্রেড-১) কেয়া খান, জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত সচিব ও মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ বশিরুল আলম, ওয়াশিংটন ডিসির অতিরিক্ত সচিব ইকোনমিক মিনিস্টার মেহেদী হাসান, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: আব্দুর রউফ, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক (সচিব) কাজী এনামূল হাসান এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মুফিদুর রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে জুলাই ঐক্যের নেতারা এ সময় সরকারের কাছে ৮ দাবি জানান। দাবিগুলো হলো- আগামী ৩১ মে এর মধ্যে তালিকায় উল্লিখিত সন্ত্রাসী দল আওয়ামী লীগের সব দোসরকে বাধ্যতামূলক অবসর দিতে হবে; তিন সরকারি কর্ম দিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করে দৃশ্যমান কাজের অগ্রগতি দেশের জনগণকে দেখাতে হবে; দেশের তথ্য পাচারকারী, ছাত্র-জনতার বুকে গুলি চালানো, নির্দেশকারী এবং সহযোগিতাকারী সব আমলা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পরিবারসহ সবার ব্যাংক হিসাব ও অবৈধ সম্পদ জব্দ করতে হবে; স্বৈরাচারের দোসর আমলা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; আগামী ৩৬ জুলাইয়ের (৫ আগস্ট) মধ্যে এখন পর্যন্ত চিহ্নিত সব স্বৈরাচারের দোসরের শ্বেতপত্র সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে; আইনের ১৩২ ধারার কারণে থানায় খুনি পুলিশদের নামে মামলা নেয়া হয় না। আগামী ৩১ মে এর মধ্যে এই ধারা বাতিল অথবা সংশোধন করতে হবে; এবং আগামী ৩১ মে এর মধ্যে সেনানিবাসে আশ্রয় নেয়া ৬২৬ জনের তালিকা প্রকাশ করতে হবে। তারা এখন কোথায় আছে এবং কতজন, কার সহযোগিতায় দেশ ছেড়েছে তাদের তালিকাও প্রকাশ করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে আগামী ৩১ মে এর মধ্যে সেনানিবাসে আশ্রয় নেয়া ৬২৬ জনের তালিকা প্রকাশ, সচিবালয় ও প্রশাসন স্বৈরাচারের দোসরমুক্ত এবং ১৩২ ধারা বাতিল বা সংশোধন না করলে ৩১ মে এর পর ছাত্র-জনতা এবং জুলাইয়ের স্পিরিট ধারণকারী সব সংগঠনকে নিয়ে মার্চ টু সচিবালয়সহ আরো কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হয়।