নিজস্ব প্রতিবেদক
সংযুক্ত আরব আমিরাতে পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদের জামিন বাতিলের জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। একই সাথে তার অন্য দেশের পাসপোর্ট থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে নিজ অফিস কক্ষের সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আদালত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞাসহ কিছু শর্তে জামিন দিয়েছেন। আমরা বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে দেশটিতে নিয়োজিত ল ফার্মকে জামিন বাতিলের আবেদন এবং আদালতে পিটিশন দাখিল করতে নির্দেশনা দিয়েছি। এ ছাড়া ইউএই রাষ্ট্রদূতের সাথে এ বিষয়ে কথা হয়েছে এবং ঠিক কী কী শর্তে তাকে জামিন দেয়া হয়েছে তা জানতে সার্টিফাইড কপি সংগ্রহের অনুরোধ করা হয়েছে। বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আইনি ও কূটনৈতিক উভয় প্রক্রিয়া সক্রিয় রয়েছে। তবে তার কাছে অন্য দেশের পাসপোর্ট থাকতে পারে, এটা আমাদের সন্দেহ।
৫ আগস্টের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তৎপরতা ও আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত এবং মাফিয়া শক্তি হিসেবে পরিচিত দলটির বর্তমানে বড় কোনো কর্মসূচি পালনের মুরদ নেই। তবে যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং বিশেষ করে পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাহিনীকে সতর্ক থাকার জন্য সাধারণ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বর্তমানে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সবধরনের উগ্রবাদী তৎপরতা মনিটর করা হচ্ছে।
নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো ধরনের অপতৎপরতার সুযোগ নেই জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তারা মাঝে মধ্যে বিদেশ থেকে সামাজিক মাধ্যমে উঁকিঝুঁকি মারা ছাড়া মাঠে কোনো প্রভাব ফেলার সামর্থ্য রাখে না। তিনি বলেন, এনসিপির ওপর ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, দেশে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা রুখতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, উগ্রবাদ দমন ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখতে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সদা তৎপর রয়েছে।
পুলিশের নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মন্ত্রী জানান, এটি পুলিশের একটি নরমাল প্র্যাকটিস। টহল বা ডিউটির সময় কেউ যেন আন-অ্যাটেন্ডেড না থাকে তার জন্য নিয়মিতই সতর্ক করা হয়। একে অন্য কোনোভাবে নেয়ার কোনো কারণ নেই।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত বলে উল্লেখ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে অস্ট্রেলিয়ার সহকারী মন্ত্রীর সাক্ষাৎ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সাথে গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার অফিসকক্ষে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব, কাস্টম ও বহুসংস্কৃতি বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।
অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধ, মানবপাচার রোধ, রোহিঙ্গা ইস্যু, জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভা, জনশক্তি রফতানি, সামুদ্রিক নিরাপত্তাসহ দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।
বৈঠকে অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘ দিনের বিশ্বস্ত উন্নয়ন ও কৌশলগত অংশীদার উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্পর্ক আগামীতে আরো সুদৃঢ় হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে বর্তমান সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল বলেন, বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মূল ভিত্তি। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু ও অংশীদার মনে করে এবং দুই দেশের এই অংশীদারিত্ব ভবিষ্যতে আরো বিকশিত হবে।
বৈঠকে ইউরোপসহ বিভিন্ন রুটে অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। অস্ট্রেলিয়ার সহকারী মন্ত্রী বাংলাদেশের নতুন মানবপাচার বিরোধী আইনের প্রশংসা করেন এবং এর কার্যকর বাস্তবায়নে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে কারিগরি ও সমন্বিত সহায়তার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, একটি সুশৃঙ্খল অভিবাসন ব্যবস্থার জন্য অনিয়মিত অভিবাসীদের মসৃণ ও দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জরুরি।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত ১৪-১৮ জুন ২০২৬ তারিখে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে নিয়মিত অভিবাসন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক মানবপাচার প্রতিরোধসহ দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে উভয়পক্ষ একমত হয়েছে।
রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবাসনই এ সঙ্কটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান। এটি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে, সে বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার সক্রিয় ভূমিকা কামনা করেন তিনি।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক ও বহিরাগমন) ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ ও রাজনৈতিক-১ অধিশাখার যুগ্ম সচিব রেবেকা খান এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল, সহকারী মন্ত্রীর চিফ অব স্টাফ ক্যামেরন গ্রিন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ড. ডেমিয়ান অলিভার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক মিনিস্টার-কাউন্সিলর (শিক্ষা ও গবেষণা) জর্জ থিভিওস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক স্টিভেন বিডল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।



