সব পানি নামবে করতোয়া নদীতে

দেড় শ’ বছরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বগুড়া সিটি করপোরেশনের মহাপরিকল্পনা

Printed Edition

আবুল কালাম আজাদ বগুড়া অফিস

দেড় শ’ বছরের পুরনো বগুড়া মহানগর টানা বৃষ্টিপাত হলেই পানির নিচে ডুবে যায়। গত সপ্তাহে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিপাতে নগরীর প্রাণকেন্দ্র সাতমাথাসহ অধিকাংশ এলাকা ডুবে যাওয়ায় জনগণের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তাই নাগরিকদের স্বস্তি দিতে তাৎক্ষণিক প্রকৌশলীদের সাথে নিয়ে মাঠে নামেন নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন। নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনকালে নতুন নতুন বড় ড্রেন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন প্রশাসক। সেই আলোকে নগরীর সাতমাথাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকার জমে থাকা পানি দ্রুত করতোয়া নদীতে ফেলার জন্য জেলা পরিষদ অফিসের সামনে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত চুন-সুরকির ড্রেন ভেঙে বড় ড্রেন নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এতে জনমনে স্বস্তি ফিরতে শুরু হয়েছে। এ ছাড়া বগুড়া-রংপুর হাইওয়ের পুরান বগুড়া রেলগেট থেকে ফটকি ব্রিজ পর্যন্ত সাত কিলোমিটার দীর্ঘ বড় ড্রেন নির্মাণের লক্ষ্যে টেন্ডার-প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এসব ড্রেন নির্মাণে মোটা টাকা প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে।

জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে ১৮৭৬ সালে বগুড়া শহর ঘোষণার পর থেকে পরিকল্পিত নগরী গড়ে ওঠেনি। অপরিকল্পিত শহর হওয়ার কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নাজুক। তাই প্রতি বছর বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার কারণে মানুষের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আর্থিক সঙ্কটের কারণে পৌর কর্তৃপক্ষ পানি নিষ্কাশনের জন্য মহাপরিকল্পনা নিতে পারেনি। গত সপ্তাহে একটানা ১৭ ঘণ্টার রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিতে শহরের সড়ক, অলিগলি সব পানির নিচে ডুবে যায়। এর ফলে কোথাও কোথাও হাঁটুসমান নোংরা পানিতে চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। বিশেষ করে নগরীর সাতমাথা এলাকা ডুবে যাওয়ার কারণে মানুষের চরম কষ্ট হয়। তাই বৃষ্টিপাতের মধ্যে রাতের বেলা প্রকৌশলীদের সাথে নিয়ে সিটি প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন জলাবদ্ধতা সরেজমিন দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন। সাতমথা এলাকার পানি দ্রুত করতোয়া নদীতে ফেলার জন্য সাতমাথা থেকে সার্কিট হাউজের পাশ দিয়ে জেলা পরিষদ ভবনের সামনে দিয়ে নির্মিত চুন সুরকির তৈরি শতবর্ষের সরু ড্রেন ভেঙে বড় ড্রেন নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া শহরের জলাবদ্ধতা দূর করতে পুরান বগুড়া তিনমাথা রেলগেট থেকে মহাসড়কের ফটকি ব্রিজ পর্যন্ত সাত কিলোমিটার দীর্ঘ এক বিশাল মেগা ড্রেন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই ড্রেনের পানি সরাসরি করতোয়া নদীতে গিয়ে মিশবে।

শহরের বাসিন্দাদের মতে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক না থাকায় এই সমস্যা হচ্ছে। অনেক জায়গায় রাস্তার চেয়ে ড্রেন বেশি উঁচু। তবে ব্যাংক কর্মকর্তা মো: খোকন মিয়া বলেন, এই দুর্ভোগের জন্য আমরাও দায়ী। প্লাস্টিক, পলিথিনসহ নানা আবর্জনা আমরা যেখানে-সেখানে ড্রেনে ফেলছি, যার কারণে পানি সরতে পারছে না ।

জলাবদ্ধতা নিয়ে সিটি প্রশাসক বলেন, বগুড়ার এই সমস্যা প্রায় ২০-২৫ বছরের পুরনো। সিটি করপোরেশন হওয়ার পর আমাদের বয়স মাত্র তিন মাস। তাই এখনই কোনো পরিবর্তন আশা করা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, শহরের ড্রেনগুলো ফাস্টফুডের পরিত্যক্ত প্যাকেটে ভরপুর। শহরটাকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতে হবে। বগুড়া শহরের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা আসলে খুবই নাজুক। করতোয়া নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা তৈরি হওয়া এবং সুবিল খালসহ বড় বড় জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নামার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, শহরের পানি সহজে নামিয়ে দেয়ার জন্য সিটি করপোরেশন এখন কিছু বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম বড় উদ্যোগ হলো একটি মেগা ড্রেন নির্মাণ। রেলগেট থেকে ফটকি ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ ১০ বাই ১০ ফিট আয়তনের এই মূল ড্রেনটি তৈরি করা হবে, যা সরাসরি করতোয়া নদীতে গিয়ে মিশবে। এর পাশাপাশি বুজরুকবাড়িয়া থেকে ফতেহ্ আলী ব্রিজ পর্যন্ত আরো পৌনে তিন কিলোমিটার সহায়ক ড্রেন তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে, যার টেন্ডারপ্রক্রিয়া দ্রুতই সম্পন্ন হবে। একই সাথে শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথার পুঞ্জীভূত পানি নিষ্কাশনের জন্য তা জেলা পরিষদের পাশের ড্রেনের সাথে যুক্ত করে। আশা করা যায় এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধতা সমস্যা থেকে নগরবাসী মুক্তি পাবেন।