মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার পুটিমারা ইউনিয়নের চড়ারহাট থেকে নওদাপাড়া সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে ছিল। যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহালেও স্থানীয় পর্যায়ে কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় এলাকাবাসী তাদের দুরবস্থার কথা কাউকে জানাতে পারছিলেন না। সম্প্রতি সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়কমন্ত্রী অধ্যাপক ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন এই সড়কটি পাকাকরণের কাজ উদ্বোধন করায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে দেশের সর্বত্র চিত্রটি এমন নয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল-অরুয়াইল সড়কটি বর্তমানে সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী। সড়কটির সংস্কারকাজ শুরু হলেও অজ্ঞাত কারণে গত ছয় মাস ধরে তা বন্ধ রয়েছে। এলাকাবাসী মানববন্ধন করে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে লিখিতভাবে জানিয়েও কোনো সুরাহা পাননি; ‘বাজেট নেই’ অজুহাতে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে কিছু কাজ হলেও অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর অবস্থা তথৈবচ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর ধরে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় দেশজুড়ে নাগরিক সেবাসহ সামগ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নকার্যক্রম ভেঙে পড়েছে। বর্তমানে যারা প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন, জবাবদিহিতা না থাকায় তারা জনদুর্ভোগের বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে তা সরকারের ওপর বাড়তি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি করবে।
মন্ত্রীর স্বীকারোক্তি ও গ্রামীণ জনপদের চিত্র
বিষয়টি স্বীকার করে নিজ জেলার অভিজ্ঞতার কথা নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়কমন্ত্রী অধ্যাপক ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামীণ অবকাঠামো খুবই নাজুক হয়ে পড়েছে। এটি শুধু দিনাজপুরে নয়, দেশের অধিকাংশ গ্রামীণ জনপদেই দৃশ্যমান। বর্তমান সরকার খুব দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছে। জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব নিলে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও উন্নয়নকার্যক্রম দ্রুত পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। কারণ, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের জীবনমান উন্নয়নই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
সূত্র মতে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন- এই পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার কাঠামোর মাধ্যমে নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে এই পুরো কাঠামো জনপ্রতিনিধিহীন হয়ে পড়ে। প্রথমে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে বসানো হলেও তারা রুটিন কাজের বাইরে তেমন কিছু করতে পারেননি। পরবর্তীতে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে অনেক জায়গায় দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। কোনো দায়বদ্ধতা না থাকায় প্রশাসকদের অনেকেই নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাড়ছে মশা, বাড়ছে অপরাধ
নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় গ্রামীণ ও শহুরে রাস্তা সংস্কারের কাজ এখন থমকে গেছে। এডিস মশার বিস্তার শহর ছাড়িয়ে এখন গ্রাম পর্যায়ে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, ফলে গ্রামাঞ্চলেও ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বাড়ছে। বর্ষা মৌসুমে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। গ্রামপর্যায়ে ছোটখাটো বিরোধ বা অপরাধের প্রথম পর্ব মীমাংসা হতো চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মাধ্যমে। অন্যদিকে, শহরের আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রদের ভূমিকা থাকে অনস্বীকার্য। নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধের প্রবণতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ নাগরিকরা।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ : ‘নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে’
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকারের সফলতা মূলত নির্ভর করে স্থানীয় সরকার কাঠামোর ওপর। প্রায় দুই বছর ধরে গ্রাম থেকে শহরে নাগরিকদের সেবা দেয়ার যে প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক বা জাল ছিল, তা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। জবাবদিহিতা না থাকায় জনসেবার পাশাপাশি সার্বিক অবকাঠামোর উন্নয়নকাজ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘শুধু সেবা নয়, স্থানীয় সরকার কাঠামোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় সব রকম নাগরিক অধিকার ব্যাহত হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও দৃশ্যমান অবনতি ঘটছে।’
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজস্ব আদায়ের সঙ্কট
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী বাজেট প্রণয়ন, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ রাস্তা, কালভার্ট ও সেচব্যবস্থার ওপর। নির্বাচিতদের অনুপস্থিতিতে বরাদ্দকৃত সরকারি অনুদান (যেমন: টিআর, কাবিখা, থোক বরাদ্দ) ব্যবহারের ক্ষেত্রে তীব্র সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে। গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর যে সামাজিক চাপ থাকে, তা আমলা বা দলীয় প্রশাসকদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এছাড়া, জনগণের সাথে নিবিড় সম্পর্কের কারণে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা স্থানীয় পর্যায়ে যে পরিমাণ কর বা রাজস্ব আদায় করতে পারতেন, বর্তমান প্রশাসন তা পারছে না।
সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে কাউন্সিলর না থাকায় নাগরিক সেবা প্রাপ্তি ও দৈনন্দিন ফাইল ছাড়ের গতি ধীর হয়ে পড়েছে। কাউন্সিলর কার্যালয় বন্ধ বা অকার্যকর থাকায় জন্মনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং ট্যাক্স, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ অধিকাংশ সেবার জন্য নগরবাসীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
আইপিডি ও সুজনের উদ্বেগ : ‘নির্বাচন বিলম্বিত করা সংবিধান পরিপন্থী’
দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে অবিলম্বে সব স্তরে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সম্প্রতি সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক বিবেচনায় দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক নিয়োগ স্থানীয় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাতন্ত্র্য ও জবাবদিহিতার পরিপন্থী। এই ধরনের নিয়োগ স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা নবগঠিত সরকারের জন্যও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করবে। সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনেই স্থানীয় সরকার পরিচালিত হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আইপিডি উল্লেখ করে, নির্বাচন বিলম্বিত করা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকারব্যবস্থা নিয়ে বর্তমানে একটি হযবরল অবস্থা বিরাজ করছে। একদিকে নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই, অন্যদিকে দলীয় প্রশাসক বসানো হয়েছে। এর ফলে নাগরিকরা তাদের কাক্সিক্ষত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সাথে জবাবদিহিতা না থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে সামগ্রিক উন্নয়নকার্যক্রম।



