বাকৃবি প্রতিনিধি
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) এক সপ্তাহের ব্যবধানে চারটি আবাসিক হলকে ঘিরে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনায় ক্যাম্পাসজুড়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ব্যক্তিগত বিরোধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথাকাটাকাটি এবং অঞ্চলভিত্তিক আধিপত্যের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিকভাবে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ১৮ জন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পাশাপাশি হলের বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধারাবাহিক সংঘর্ষের ঘটনায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। ক্যাম্পাসে স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
গত ২৩ ও ২৪ জুলাই শহীদ শামসুল হক হল ও আশরাফুল হক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষ হয়। ওই সময় দুই শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া উত্তেজনা পরে দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ঘটনায় ১৩ জন শিক্ষার্থী আহত হন এবং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ফসিলের মোড় এলাকায় চা খেতে যাওয়া আশরাফুল হক হলের কয়েকজন শিক্ষার্থীর ওপর শহীদ শামসুল হক হলের ৪০ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। এতে দোকানে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। পরে খবর ছড়িয়ে পড়লে আশরাফুল হক হলের শিক্ষার্থীরা লাঠিসোটা ও ইট-পাটকেল নিয়ে শামসুল হক হলের সামনে গিয়ে হামলা চালায়।
হামলার একাধিক ভিডিওতে বৈদ্যুতিক বাতি ও হলের গেটের লোগো ভাঙচুর এবং ইট-পাটকেল নিক্ষেপের দৃশ্য দেখা যায়। কয়েকটি বিকট শব্দও শোনা যায়, যা প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী চকোলেট বোমা বা ককটেল সদৃশ বিস্ফোরক হতে পারে। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। আশরাফুল হক হলের এক শিক্ষার্থী দাবি করেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। অন্য দিকে শহীদ শামসুল হক হলের শিক্ষার্থী রুপায়ন ভূঁইয়া বলেন, আগের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে অনলাইনে কটূক্তি ও বিদ্রƒপমূলক পোস্টের জেরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং পরে আশরাফুল হক হলের শিক্ষার্থীরা তাদের হলের গেটে হামলা ও ভাঙচুর চালান।
ওই ঘটনায় একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ভাঙচুরের সময় প্রক্টরিয়াল বডি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রায় ১০ মিনিট অবস্থান করার পর তারা সেখান থেকে চলে যান বলেও অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো: আবদুল আলীমের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত শনিবার মধ্যরাতে মওলানা ভাসানী হল ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের প্রথম বর্ষের (২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কৃষি অনুষদের প্রথম বর্ষের একটি মেসেঞ্জার গ্রুপে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে শুরু হওয়া বাগি¦তণ্ডা পরে অঞ্চলভিত্তিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনায় রূপ নেয়। এ নিয়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য প্রতিষেধক শাখার চিকিৎসক ডা: আমিনুল মতিন জানান, আহত পাঁচজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হলে ফিরে গেছেন।
মওলানা ভাসানী হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই শিক্ষার্থীর কথাকাটাকাটি জেলাভিত্তিক আধিপত্যের বিরোধে রূপ নেয়। পরে সোহরাওয়ার্দী হলের সামনে গেলে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী সোহরাওয়ার্দী হলের এক শিক্ষার্থী দাবি করেন, ভাসানী হলের শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতে দিতে তাদের হলের সামনে এসে উসকানিমূলক আচরণ করলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো: বজলুর রহমান মোল্যা বলেন, এ ধরনের সংঘর্ষ দুঃখজনক। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে। উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা হবে।
মওলানা ভাসানী হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শরীফ-আর-রাফি বলেন, সংঘর্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত এবং বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি। বিষয়টি ভিসিকে জানানো হয়েছে এবং লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। তদন্তসাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। শহীদ শামসুল হক হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো: আব্দুল আওয়াল বলেন, হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। আশরাফুল হক হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলম মিয়া জানান, ঘটনার তদন্তে কমিটি গঠনের কার্যক্রম চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, এসব ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



