বিশেষ সংবাদদাতা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ১০০ শতাংশ বাড়িয়ে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। একই সাথে কম আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে বেতন বৃদ্ধির ধাপ নির্ধারণ এবং অবসরপ্রাপ্তদের নিট পেনশন ৫৫ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বেতনস্কেল অনুমোদন করা হয়। নতুন বেতনস্কেলের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্রবাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলি ২০২৬-ও অনুমোদন করা হয়েছে। উভয় সিদ্ধান্তই ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের ওপর একসাথে বড় আর্থিক চাপ এড়াতে আগামী দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর হবে। বিভিন্ন ভাতা একসাথে কার্যকর হবে ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এতে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্কের (এমটিবিএফ) আওতায় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাজেটে এ অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে।
কমছে বেতন বৈষম্য
নতুন বেতনস্কেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের ব্যবধান কমিয়ে আনা। বিদ্যমান কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত ১:১.৯৪৫। নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে।
নতুন বেতনস্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। তবে প্রতিটি গ্রেডের মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ এ গ্রেডের মূল বেতন বাড়ছে প্রায় ১৪২ শতাংশ।
অন্যদিকে সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। ফলে সর্বোচ্চ গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার দাঁড়াচ্ছে ১০০ শতাংশ।
সরকার বলছে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
দুই ধাপে নয়, তিন ধাপে মূল বেতন
নতুন বেতনস্কেল একসাথে পুরোপুরি কার্যকর করা হচ্ছে না। সরকারের ওপর আর্থিক চাপ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে। তবে নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কমাতে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
অন্যদিকে নতুন বেতন কাঠামোর বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একসাথে কার্যকর হবে। ফলে বেতন বৃদ্ধির সাথে ভাতাগুলো একসাথে চালু না হওয়ায় সরকারের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকবে।
পেনশনে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি
নতুন বেতনস্কেলের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তও বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি দিতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাবেন।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়বে। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি হবে ৭৫ শতাংশ।
এ ছাড়া ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ৫৫ শতাংশ বাড়বে।
সরকার মনে করছে, এ ব্যবস্থা অবসরপ্রাপ্তদের জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবেলা এবং বার্ধক্যজনিত আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়ক হবে।
২০৩০ সালের মধ্যে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’
নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ (ঙহব জধহশ ঙহব চবহংরড়হ বা ঙজঙচ) ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তও রয়েছে সরকারের। সামরিক ও অসামরিক উভয় ক্ষেত্রে একই সময়ে এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তবে বিপুল আর্থিক সংস্থান প্রয়োজন হওয়া এবং অসামরিক কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের আগের অবসরগ্রহণকারীদের পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় তা তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। সরকার পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে ঙজঙচ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য ভাতা
সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো পৃথক ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। নতুন কাঠামোয় প্রতিটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে তিন হাজার টাকা ভাতা দেয়া হবে।
এ ছাড়া ডিজিটাল যোগাযোগ ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ফোনের ভাতার আওতা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এতদিন কেবল পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীরা এ সুবিধা পেতেন। নতুন বেতনস্কেলে সব গ্রেডের কর্মচারী মোবাইল ফোনের ভাতা পাবেন।
জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কাঠামো
জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক বেতনস্কেল অনুমোদন করা হবে। জাতীয় বেতনস্কেলের মতো এ বেতনস্কেলও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বেতন কমিশনের সুপারিশের পর সিদ্ধান্ত
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন। এসব প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার সুপারিশ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি সচিব কমিটি গঠন করে।
সচিব কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে মন্ত্রিসভায় বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং জনপ্রশাসনে দক্ষতা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, নতুন বেতনস্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্নীতির প্রণোদনা কমানো, দক্ষ জনবল ধরে রাখা এবং অধিকতর গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।
অর্থ বিভাগ নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের জন্য শিগগিরই প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। এতে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন ও অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধার বিস্তারিত বিধান থাকবে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদফতর, দফতর ও সংস্থাগুলোকে নতুন কাঠামো যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হবে।



