করমুক্ত আয়সীমা বেড়েছে কিন্তু কমেনি সংসারের খরচ

শাহ আলম নূর
Printed Edition

ব্যক্তি-শ্রেণীর করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। এতে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীরা কিছুটা কর সুবিধা পেলেও তাদের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সংসারের বাড়তি খরচ অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, লাগামহীন নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে যখন অধিকাংশ পরিবারের বাজেট হিমশিম খাচ্ছে, তখন বছরে সামান্য কর সাশ্রয় কতটা স্বস্তি দেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও মধ্যবিত্তের প্রকৃত স্বস্তি নির্ভর করবে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ওপর।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক সময় ১০ শতাংশের ওপরে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, গোশত, সবজি থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসাভাড়ার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বেতননির্ভর মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর।

ক্যাবের গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৪৫ হাজার টাকা বেতনের একজন চাকরিজীবীর মাসিক ব্যয়ের একটি সাধারণ হিসাব করলে দেখা যায়, বাসাভাড়ায় ১৪ হাজার টাকা, খাদ্যে ১৬ হাজার টাকা, যাতায়াতে ৩ হাজার টাকা, সন্তানের শিক্ষায় ৪ হাজার টাকা, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানিসহ ইউটিলিটিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা, চিকিৎসা ও ওষুধে ২ হাজার টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৩ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হয়। সব মিলিয়ে মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ মাস শেষে সঞ্চয়ের সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।

এমন বাস্তবতায় করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়ানোর অর্থ কী। কর বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা করমুক্ত হওয়ায় একজন করদাতা সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ করহার অনুযায়ী বছরে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৫০ টাকা কর সাশ্রয় করবেন। মাসিক হিসাবে যা মাত্র ১০৪ টাকা। অর্থাৎ প্রতিদিনের হিসাবে সাশ্রয় দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৩ টাকা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান বাজারে এই অর্থ দিয়ে এক কাপ চাও কেনা সম্ভব নয়। রাজধানীতে এক কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, গরুর গোশত ৮০০ টাকার বেশি, সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ২০০ টাকার কাছাকাছি এবং সাধারণ মানের চালের দামও কয়েক বছর আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে মাসে ১০৪ টাকার কর সুবিধা বাস্তব জীবনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, যদি একজন মানুষ বছরে এক হাজার বা দেড় হাজার টাকা কর সাশ্রয় করেন; কিন্তু একই সময়ে বাজারদরের কারণে তার অতিরিক্ত ব্যয় বছরে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা বেড়ে যায়, তাহলে করছাড়ের প্রভাব কার্যত হারিয়ে যায়। মানুষের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রকৃত আয় বৃদ্ধি।

কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং ন্যূনতম পারিবারিক ব্যয়কে বিবেচনায় নেয়া উচিত। তাদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় করমুক্ত আয়সীমা কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা হওয়া উচিত ছিল। এতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীরা আরো বাস্তব সুবিধা পেতেন।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমান করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক বলতে হবে। তবে এটি মধ্যবিত্তের প্রকৃত সমস্যা সমাধান করবে না। কারণ মধ্যবিত্তের প্রধান সঙ্কট এখন কর নয়, বরং উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়। বাসাভাড়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য খাতে ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে এই করছাড়ের প্রভাব সীমিত থাকবে।

তিনি বলেন, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সরকারের পক্ষ থেকে মধ্যবিত্তের প্রতি একটি ইতিবাচক বার্তা। তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এর সুফল সীমিত। কারণ বর্তমানে একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয় যেখানে ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে, সেখানে মাসে ১০৪ টাকার করসাশ্রয় তাদের আর্থিক অবস্থার কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটাবে না।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, মধ্যবিত্তের আয় বাড়ার তুলনায় ব্যয় অনেক দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে নগরাঞ্চলে বসবাসকারী পরিবারগুলোর আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে বাসাভাড়া ও খাদ্য ব্যয়ে। ফলে করছাড়ের এই সুবিধা অনেকটাই প্রতীকী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির পাশাপাশি রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা পুরো বছরজুড়ে উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব করদাতাদের জন্য বড় সুবিধা হবে। এতে কর প্রশাসনের ওপর চাপ কমবে এবং স্বেচ্ছায় কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা ১ কোটির বেশি হলেও নিয়মিত রিটার্ন জমা দেন তুলনামূলক কমসংখ্যক করদাতা। করব্যবস্থাকে আরো সহজ, স্বচ্ছ ও করদাতাবান্ধব করতে পারলে রাজস্ব আদায় বাড়বে। শুধুমাত্র করমুক্ত আয়সীমা সামান্য বাড়িয়ে রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

সংশ্লিষ্ঠরা বলছেন, প্রকৃত স্বস্তি দিতে হলে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যয় কমানো এবং আবাসন খাতে চাপ কমানোর মতো নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় করছাড়ের সুফল বাজারের মূল্যবৃদ্ধির ভেতরেই হারিয়ে যাবে। তারা বলছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্তের জন্য ইতিবাচক হলেও এর আর্থিক প্রভাব সীমিত। একজন করদাতার বছরে প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকা বা মাসে ১০৪ টাকার সাশ্রয় বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিতে পারবে না। ফলে এই উদ্যোগকে অনেকেই মধ্যবিত্তের জন্য বাস্তব স্বস্তির চেয়ে ‘গাণিতিক সান্ত¡না’ বলেই মনে করছেন। তবে করব্যবস্থাকে আরো মানবিক ও বাস্তবমুখী করার পথে এটি একটি ছোট পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।