২০২৪ সালের জুলাইয়ের রক্তাক্ত দিনগুলো অসংখ্য পরিবারকে স্বজনহারা করেছে। সেসব বেদনাময় ঘটনার মধ্যে অন্যতম শহীদ রফিকুল ইসলামের পরিবারের গল্প। ঘটনার আট মাস পর পরিবারের সদস্যরা তার পরিচয় নিশ্চিত করতে সক্ষম হলেও সরকারি গেজেটে নামের ভুল, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জটিলতা এবং অনুদান নীতিমালার সীমাবদ্ধতায় এখনো ন্যায়বিচার ও প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত তারা।
শৈশবেই বাবা-মাকে হারিয়ে এতিম হয়ে পড়েন রফিকুল ইসলাম। বড় বোন ও ভগ্নিপতির স্নেহ-ভালোবাসায় ঢাকায় বেড়ে ওঠেন তিনি। ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পবিত্র কুরআনের হাফেজ হন। জীবিকার জন্য টাইলস মিস্ত্রির কাজ বেছে নেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে বড় ভাই গ্রামে কর্মরত, মেজো ভাই একটি মাদরাসায় চাকরি করেন এবং ছোট ভাই ভগ্নিপতির সহায়তায় সৌদি আরবে কর্মরত। কঠোর পরিশ্রম করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখলেও তা আর পূরণ হয়নি।
আন্দোলনের দিনেই প্রাণহানি
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় ঢাকার বাসা থেকে বের হন রফিকুল ইসলাম। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় পৌঁছানোর পর চলমান ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। একটি গুলি তার বাম চোখে বিদ্ধ হয় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে। মেডিক্যাল নথিতেও বাম চোখে গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনার পর থেকেই তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর শুরু হয় পরিবারের দীর্ঘ অনুসন্ধান। হাসপাতাল, থানা, কারাগারসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নেয়া হয় এবং একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়; কিন্তু আট মাসেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি।
আট মাস পর পরিচয় শনাক্ত
রফিকুল ইসলামের ভগ্নিপতি রেজাউল করিম জানান, আট মাস পর কাকরাইলের আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে সংরক্ষিত অজ্ঞাত লাশের ছবির সাথে মিলিয়ে তারা রফিকুলকে শনাক্ত করেন। পরে জানা যায়, তার লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে শাহবাগ থানা হয়ে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে দাফনের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছিল।
দাফনের আগে তার ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মালিবাগে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে পরিবারের সদস্যদের রক্তের নমুনা নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় মিল পাওয়ার পর লাশের পরিচয় নিশ্চিত হয়।
পরিবারের দাবি, রফিকুলকে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের একটি গণকবরে দাফন করা হয়েছিল। পরে সরকারি উদ্যোগে গণকবর থেকে লাশ উত্তোলন ও শনাক্তকরণ কার্যক্রমে তার কবরও নিশ্চিত করা হয়।
গেজেটে ভুল নাম, অনুদানেও জটিলতা
পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে প্রকাশিত সরকারি শহীদ গেজেটে রফিকুল ইসলামের নাম ভুলবশত ‘রাকিবুল’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি তার ছবি ও ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারও অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এ ভুল সংশোধনের জন্য সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে আবেদন করা হয়েছে। পরিবারের আরো অভিযোগ, বর্তমানে সরকারি অনুদান নীতিমালা অনুযায়ী শহীদের স্ত্রী, সন্তান বা বাবা-মা অনুদানের জন্য অগ্রাধিকার পান; কিন্তু অবিবাহিত এবং বাবা-মা না থাকলে ভাই-বোন বা অন্যান্য বৈধ উত্তরাধিকারী অনুদান পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এ নীতিমালার পরিবর্তন করে বৈধ ওয়ারিশদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিচারের অপেক্ষায় পরিবার
রফিকুল ইসলামের পরিবারের মতে, আর্থিক অনুদানের চেয়ে তাদের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা। এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রথম দিকে মামলা গ্রহণে জটিলতা থাকলেও বর্তমানে তদন্তভার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিবার জানায়, তদন্তের স্বার্থে সিআইডি ইতোমধ্যে তাদের সাথে যোগাযোগ করেছে এবং মামলার তদন্ত এগিয়ে চলছে। রফিকুল ইসলামের পরিবারের একটাই প্রত্যাশা যারা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। একই সাথে রাষ্ট্র যেন একজন শহীদের যথাযথ পরিচয়, মর্যাদা ও তার পরিবারের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করে।



