বিভিন্ন সেক্টরে ফ্যাসিবাদী তৎপরতায় জনমনে অসন্তোষ

দেশের বিভিন্ন সেক্টরে ফ্যাসিবাদের দোসর ও সুবিধাভোগীরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। পুরনো ভাবাদর্শিক বন্দোবস্ত এবং ষড়যন্ত্রকারীদের তৎপরতাও দৃশ্যমান হচ্ছে। অনেক পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্বেও আসছে এই ফ্যাসিবাদীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের কৌশলগত নীরবতার কারণে রাষ্ট্রকাঠামোর আমলাতন্ত্র, বিচার বিভাগ, অর্থনীতি, শিক্ষাঙ্গনসহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই পুনর্বাসনপ্রক্রিয়া স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে অসন্তোষ ও একইসাথে ভীতি বাড়ছে।

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition
জুলাই-আগাস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
জুলাই-আগাস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

দেশের বিভিন্ন সেক্টরে ফ্যাসিবাদের দোসর ও সুবিধাভোগীরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। পুরনো ভাবাদর্শিক বন্দোবস্ত এবং ষড়যন্ত্রকারীদের তৎপরতাও দৃশ্যমান হচ্ছে। অনেক পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্বেও আসছে এই ফ্যাসিবাদীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের কৌশলগত নীরবতার কারণে রাষ্ট্রকাঠামোর আমলাতন্ত্র, বিচার বিভাগ, অর্থনীতি, শিক্ষাঙ্গনসহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই পুনর্বাসনপ্রক্রিয়া স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে অসন্তোষ ও একইসাথে ভীতি বাড়ছে।

সূত্র মতে, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চেপে বসা ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে। স্বৈরাচারী সরকারের প্রধান নির্বাসনে গেলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীরে প্রোথিত ফ্যাসিবাদী নেটওয়ার্ক এখনো বিলুপ্ত হয়নি। বর্তমান বাংলাদেশে এই নেটওয়ার্কটি তার প্রকাশ্য রূপ হারিয়ে এখন ছদ্মবেশে, ভিন্ন কৌশলে এবং গোপনে সক্রিয় রয়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের কিছু চিহ্নিত কর্মকর্তাকে অপসারণ বা ওএসডি করা হলেও মধ্যম ও মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনে এখনো পুরনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা বড় সংখ্যায় বহাল আছে। সরকারের জনকল্যাণমুখী ও সংস্কারমূলক সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ইচ্ছাকৃত ধীরগতি সৃষ্টির অভিযোগ উঠছে এদের বিরুদ্ধে। সরকারের ভেতরের গোপন বা সংবেদনশীল তথ্য বাইরে পাচার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর পেছনে প্রশাসনের এই অংশ জড়িত বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে চরমভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা মাঠপর্যায়ের অনেক পুলিশ কর্মকর্তা এখনো পুরনো রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে পূর্ণ শক্তিতে দায়িত্ব পালন করছে না। এতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটছে এবং অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। বিচার বিভাগকে ফ্যাসিবাদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, যেখানে বিরোধী মত দমনে আদালতকে ঢাল বানানো হতো। উচ্চ আদালত থেকে নিম্ন আদালত পর্যন্ত এই নেটওয়ার্ক এখনো পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় ফ্যাসিবাদী অপরাধীদের জামিন পাওয়া বা তদন্তে শিথিলতা দেখানোর পেছনে বিচার বিভাগে থাকা পুরনো নেটওয়ার্কের প্রচ্ছন্ন হাত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন জেলা ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনে পুরনো প্যানেলের আইনজীবীরা এখনো সংগঠিত। বিগত আমলে ব্যাংক লুটপাট, অর্থপাচার এবং মেগা প্রজেক্টের নামে যে লুণ্ঠন হয়েছে, তার সুবিধাভোগী ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট এখনো দেশের বাজার ও আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণ করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কৃত্রিমসঙ্কট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরির চেষ্টা চলছে। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হলেও পুরনো খেলাপি ঋণগ্রহীতা ও পাচারকারীরা এখনো সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, চিকিৎসকদের সংগঠন এবং প্রকৌশলীদের সংস্থায় পুরনো ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা এখনো সিন্ডিকেট ধরে রেখেছে। কিছু মূলধারার গণমাধ্যম, যা বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন, তারা সরকারের সাফল্যগুলোকে আড়াল করে ছোটখাটো ব্যর্থতাকে বড় করে দেখাচ্ছে।

সরকারের বিরুদ্ধে নানাভাবে এখনও চক্রান্তের এক বিরাট জাল বিস্তার করার চেষ্টা করা হচ্ছে অভিযোগ করে নয়া দিগন্তকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, এই সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুধু নয়, মব কালচার তৈরি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আজকে যদি কোনো ছিদ্রপথে পুরনো ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে কেউই কিন্তু রক্ষা পাবে না। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব তো যাবেই, গণতন্ত্র তো গোরস্থানে চলে যাবে। তারপরের কী ভয়াবহ পরিণতি হয়, সেটা সবাই টের পাবে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই দেশ আবারো কর্তৃত্ববাদী শাসনে ফিরে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলো পুনর্বহাল করার পাশাপাশি গণভোটে পাস হওয়া সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে দেশ আবারো আগের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথে ফিরে যেতে পারে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার ঝুঁকি তৈরি হবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি বলেন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে ফ্যাসিবাদী উপাদানের সরব উপস্থিতি রয়েছে। এর দায় বর্তমান সরকারের। কারণ সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তিনি বলেন, গত দেড় দশকে যারা ফ্যাসিবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, রাষ্ট্রকাঠামোর বিভিন্ন জায়গায় তাদের অনেকের অংশীদারত্ব দেখা যাচ্ছে। তারা আবারো সক্রিয় হচ্ছে। আমরা মনে করি, এটি সরকারের ব্যর্থতা।

সূত্র মতে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনেও চাঁদাবাজির প্রবণতা কমেনি। শুধু রূপ বদলেছে। অভিযোগ উঠেছে, ফ্যাসিবাদের বড় একটি অংশের সাথে বর্তমান রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশে এটি করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের পর দেশে চাঁদাবাজি কম থাকলেও সাবেক ফ্যাসিস্টদের সাথে সিন্ডিকেট করে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মী। এতে সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে সর্বস্তরের মানুষ উদ্বিগ্ন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে আমলাতন্ত্রের সংস্কার, সব ক্ষেত্রেই একটি অদৃশ্য ক্ষমতাবলয় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যারা সুবিধাভোগী আমলা, ব্যবসায়ী বা মাফিয়া গোষ্ঠী ছিল, তারাই এখন বর্তমান কাঠামোর সুবিধা নিচ্ছে। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের যে মৌলিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়েছিল, তা আজ গভীর সঙ্কটের মুখে। তিনি অভিযোগ করেন, ফ্যাসিস্ট আমলের দোসররা বিভিন্ন মিডিয়া হাউজে আবার শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার ব্যাংক লুটপাটকারীদের প্রটেকশন দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ আমলে তৈরি হওয়া ‘অলিগার্ক মাফিয়াতন্ত্র’ ভাঙার পরিবর্তে সরকার তাদের আবার ব্যাংকিং করার সুযোগ করে দিচ্ছে।

সূত্র মতে, দেশের অধিকাংশ পেশাজীবী সংগঠনে সক্রিয় হয়ে উঠছে ফ্যাসিবাদীরা। তারা বিভিন্ন নির্বাচনেও অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে ফরিদপুর জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে অংশ নিয়ে চারটি পদে বিজয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। লক্ষ্মীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির বার্ষিক নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ আটটি পদে বিজয়ী হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সক্রিয় হচ্ছে ফ্যাসিস্টরা। সম্প্রতি দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় তারা কর্মসূচিও পালন করছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, নির্বাচন পরবর্তীতে ভয়ভীতি কিছুটা কমে আসায় তারা এখন মাঠ যাচাই করছেন। সীমিত পরিসরের কর্মসূচি দিয়ে সরকারের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছেন। এক্ষেত্রে সরকারে বিএনপির আসাকে আশীর্বাদ মানছেন তারা।

জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতির মাঠে ফেরার কৌশল খুঁজছে ফ্যাসিবাদীরা। সুযোগ পেলে দলটি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে সামাজিকভাবে স্বচ্ছ ও সজ্জন দলীয় ব্যক্তিদের প্রার্থী করা ও সমর্থন দেয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। এ ছাড়া বামদের ওপর ভর করে দেশকে অস্থিতিশীল করার মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশল অবলম্বনের চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। যাতে সরকার এবং দেশ অস্থিতিশীল থাকে, আর নেপথ্যে আওয়ামী লীগ সুবিধা পায়।