সর্বোচ্চ মান ও কোয়ালিটি চেক নিশ্চিত করেই উৎপাদিত হচ্ছে দেশের ওষুধ

আন্তর্জাতিক বাজারে অপপ্রচার সত্ত্বেও কমেনি রফতানি

Printed Edition

হামিম উল কবির

অপার সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে একশ্রেণীর অসাধু চক্র, নকল ও ভেজাল ওষুধ ব্যবসায়ীরা কলকাঠি নাড়ছে। দেশের ওষুধ শিল্পের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বাজারে নকল ও ভেজাল ওষুধের সয়লাবের বানোয়াট তথ্য ছড়িয়ে অসন্তোষ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশে ওষুধ নকল বা ভেজাল- এমন খবর প্রচারিত হলেই তা সংগ্রহ করে রফতানিকারক দেশগুলোর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয় অথবা সেখানকার ব্যবসায়ীদের নজরে এনে রফতানি বাজার বিনষ্টের ষড়যন্ত্র করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহকৃত বাংলাদেশের সব ওষুধ উন্নত দেশের সমমানের হওয়ায় এসব বিরূপ অপপ্রচার ছাপিয়েই এগিয়ে চলেছে ওষুধ রফতানি।

বাংলাদেশী ওষুধের মান ও আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলেছে নয়া দিগন্ত। তারা জানান, বাংলাদেশ বিশ্বমানের ওষুধ উৎপাদন করে এবং আমদানিকারক দেশগুলো এই সুনামের ব্যাপারে পুরোপুরি ওয়াকিফ। কোনো দায়িত্বশীল ওষুধ প্রতিষ্ঠান এই অর্জন ও সুনাম নষ্ট হতে দেবে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান ও সিইও মো: হালিমুজ্জামান বলেন, ‘মানসম্পন্ন প্রতিটি ওষুধ কোম্পানি উৎপাদনের আগে নির্দিষ্ট কক্ষের এয়ার কোয়ালিটি বা বাতাসের মান নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে নেয়। তা ছাড়া সেখানে কোনো অণুজীব (মাইক্রোবস) আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সোয়াব রেখে নির্দিষ্ট সময় পর অণুজীববিজ্ঞান (মাইক্রোবায়োলজি) ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। সোয়াবে কোনো অণুজীবের উপস্থিতি বা বাতাসে কোনো ক্ষুদ্রকণা (পার্টিকল) পাওয়া গেলে কক্ষটি সম্পূর্ণ স্যানিটাইজ ও পার্টিকলমুক্ত করার পরেই উৎপাদন শুরু হয়।’

ওষুধ বিনষ্টকরণ এবং পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে মো: হালিমুজ্জামান জানান, বাজারে কোথাও নকল বা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেলে পরিবেশ অধিদফতরের বাধ্যবাধকতা মেনে বৈজ্ঞানিক উপায়ে তা ধ্বংস করা হয়। প্রতি বছর পরিবেশ অধিদফতর এই ডিসপোজাল ব্যবস্থা পরিদর্শন করে সার্টিফিকেট প্রদান করে। তিনি আরো জানান, তরল ওষুধ কারখানার ইটিপিতে (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) শোধন করা হয় এবং কঠিন ওষুধ পোড়ানো হয় উচ্চ প্রযুক্তির ‘ইনসিনারেশন প্ল্যান্টে’। নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনুসরণের ফলে মাটি বা পানিতে রাসায়নিকের কোনো অবশেষ (রেসিডুয়ারি) থাকে না। পরিবেশসম্মত উপায়ে পোড়ানোর পর বাধ্যতামূলকভাবে সেই রিপোর্ট পরিবেশ অধিদফতরে জমা দেয়া হয়।

সরকারি নজরদারি দলের সীমাবদ্ধতা থাকায় দেশের প্রায় সব বড় ওষুধ কোম্পানির নিজস্ব মনিটরিং টিম রয়েছে। কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা জানান, নিজস্ব টিমগুলো ক্রেতা সেজে সন্দেহভাজন স্থান থেকে ওষুধ সংগ্রহ করে কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাবে পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় নকল বা ভেজাল প্রমাণিত হলে তা তাৎক্ষণিকভাবে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে অবহিত করা হয় এবং বাজার থেকে তা তুলে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

দেশীয় গণমাধ্যমে প্রায়শই নকল, মানহীন উপাদান বা সঠিক মাত্রার কার্যকর উপাদান (এপিআই) না থাকা নিয়ে প্রচারিত ঢালাও খবরের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মো: হালিমুজ্জামান বলেন, ‘প্রতিবেদন প্রকাশের আগে দায়িত্বশীল ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেয়া উচিত। বাংলাদেশের ওষুধ অত্যন্ত মানসম্পন্ন বলেই বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে সফলভাবে রফতানি হচ্ছে।’

একটি শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নয়া দিগন্তকে জানান, মূলধারার কোনো নিবন্ধিত ওষুধ কোম্পানির পক্ষে এসব অসদুপায় অবলম্বন করা অসম্ভব। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে ওষুধ সরবরাহের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের কঠোর ল্যাব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। দেশীয় বাজারে কারচুপি করলে আন্তর্জাতিক আস্থা ও সনদ দুটিই হারাতে হবে। তবে কিছু অসাধু চক্র গোপনে এই অপকর্মের সাথে জড়িত। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের সার্বিক সহায়তায় এসব ভুয়া ও ভেজাল কারবারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।