আলমগীর কবির
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এআই এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ওপর সম্ভাব্য নতুন সরকারি বিধিনিষেধ নিয়ে নিজেদের অনড় ও কঠোর অবস্থানের কথা স্পষ্ট করেছে বৈশ্বিক স্ট্রিমিং জায়ান্ট নেটফ্লিক্স। লন্ডনে আয়োজিত ‘এন্ডার্স টিএমটি লিডার্স লাইভ’ কনফারেন্সে প্রতিষ্ঠানের ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের কনটেন্ট বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ল্যারি তানজ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যেকোনো ঢালাও বা ‘ওয়ান-সাইজ-ফিটস-অল’ নীতিমালা কনটেন্ট নির্মাণের স্বাধীনতা এবং নতুন প্রতিভাদের বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর অতিরিক্ত কর বা লেভি আরোপের চলমান আলোচনার সূত্র ধরে তানজ এই মন্তব্য করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ একসময় কেবল তাদের বিনিয়োগের পরিমাণই নির্ধারণ করে দেবে না; বরং তারা কী ধরনের কনটেন্ট তৈরি করবে তাও ডিক্টেট করতে শুরু করবে।
লন্ডনের এই কনফারেন্সে নেটফ্লিক্সের পক্ষ থেকে যখন নীতিমালার বিরোধিতা করা হচ্ছিল, তার মাত্র কয়েক দিন আগেই ‘এসএক্সএসডব্লিউ লন্ডন ২০২৬’-এর মঞ্চে জনপ্রিয় সিরিজ ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’-এর নির্মাতা স্টিভেন নাইট বিদেশি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর লেভি ধার্য করার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন। এর আগে ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি কমিটিও নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন, অ্যাপল টিভি প্লাস এবং ডিজনি প্লাসের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর তাদের স্থানীয় সাবক্রিপশন আয়ের ৫ শতাংশ লেভি আরোপের সুপারিশ করেছিল, যা দিয়ে স্থানীয় ব্রিটিশ ড্রামা প্রোডাকশনে অর্থায়ন করা যায়। স্টিভেন নাইট যুক্তি দেন, এই স্ট্রিমিং জায়ান্টরা ব্রিটেনে এসে বড় বড় ব্লকবাস্টার প্রজেক্ট তৈরি করে কর্মসংস্থান বাড়াচ্ছে ঠিকই; কিন্তু ব্যবসার সব মুনাফা নিজেদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে। এটি কোনো ট্যাক্স নয়; বরং একটি ‘দ্বিমুখী রাস্তা’ হওয়া উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানকার অবকাঠামো ও সাফল্য টিকিয়ে রাখতে মুনাফা বা আয়ের অন্তত ১ থেকে ২ শতাংশ অর্থ স্থানীয় জিনিসের জন্য রেখে যাওয়া উচিত।
তবে নেটফ্লিক্স এই ‘লেভি’ বা পেনাল্টির ধারণাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ল্যারি তানজ পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, ২০১৬ সাল থেকে নেটফ্লিক্স যুক্তরাজ্যের ২২৫টিরও বেশি শহর ও জনপদে শুটিং করেছে এবং ‘অ্যাডোলেসেন্স’ বা ‘বেবি রেইনডিয়ার’-এর মতো ব্রিটিশ কনটেন্টগুলোকে বিশ্বমঞ্চে সুপারহিট করে তুলেছে। নেটফ্লিক্স কোনো ‘ব্ল্যাক বক্স’ নয় যে স্থানীয় বাজার থেকে টাকা তুলে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করছে; বরং তারা অর্জিত রাজস্ব স্থানীয় প্রোগ্রামিংয়েই পুনঃবিনিয়োগ করছে। তানজ সতর্ক করেন, কঠোর নিয়মের বেড়াজালে পড়া মানেই সৃজনশীল ঝুঁকি নেয়ার পথ বন্ধ হওয়া, যার ফলে পুরো বাজার কেবল প্যারামাউন্ট স্কাইডান্সের মতো বড় মিডিয়া গ্রুপ, প্রাইভেট ইক্যুইটি বা সোভেরেন ওয়েলথ ফান্ডগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তিনি ‘ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে’ এমন একচেটিয়া ভবিষ্যতের দিকে পা না বাড়াতে নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানান।
এদিকে কনফারেন্সে ওটিটি খাতের আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআইয়ের ব্যবহার এবং এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নেটফ্লিক্সের অবস্থান পরিষ্কার করেন তানজ। তিনি জানান, এআই ব্যবহারে নেটফ্লিক্স অত্যন্ত ‘সতর্ক’ এবং তারা কপিরাইট সুরক্ষা ও ডিজিটাল রেপ্লিকা বা ক্লোন তৈরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের সম্মতির নীতিতে বিশ্বাসী। বিদ্যমান আইনি কাঠামো এবং শক্তিশালী চুক্তির মাধ্যমেই নতুন প্রযুক্তিকে সামলানো সম্ভব বলে মনে করে প্রতিষ্ঠানটি।
এআই কখনোই মানুষের সৃজনশীলতার বিকল্প হতে পারে না উল্লেখ করে ল্যারি তানজ বলেন, স্ক্রিপ্ট, অভিনয়, পরিচালনা এবং সেটের ভেতরের মানবিক রসায়নই একটি ভালো কনটেন্টের মূল প্রাণ। নেটফ্লিক্সের কাছে যেকোনো নতুন প্রযুক্তির কার্যকারিতার মূল পরীক্ষা একটিই, তা নির্মাতাদের আরো ভালো গল্প বলতে সাহায্য করছে কি-না এবং দর্শকরা সহজে তা খুঁজে পাচ্ছে কি-না। পরিশেষে, টেলিভিশনের ঐতিহ্যবাহী ধারা নেটফ্লিক্সকে কীভাবে বদলে দিয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তানজ গর্বের সাথে বলেন, এই পরিবর্তনের ফলে নেটফ্লিক্স এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্থানীয়, অনেক বেশি দায়িত্বশীল এবং এই বিনোদন ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ে আরো বেশি উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠেছে।



