নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের দুর্ভোগ কমাতে কাঁচামরিচ ও টমেটোর শুল্ক প্রত্যাহারের চিন্তা করছে সরকার। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব আজ সোমবার বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠিতব্য মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ। এটি সভায় অনুমোদন হলে কাঁচামরিচ ও টমেটো আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে। বর্তমানে এই নিত্যপণ্য দু’টি আমদানিতে ব্যবসায়ীদের ৫৮.৬ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হয়। মন্ত্রিপরিষদ সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এটি ছাড়াও আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে মন্ত্রিসভা-বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক (মে-জুলাই) প্রতিবেদন, ন্যাশনাল স্ট্রাটেজি অ্যান্ড মাল্টিইয়ার একশান প্লান ফর এ লিড ফ্রি বাংলাদেশ এর খসড়া এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হতে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল ৩ (তিন) বছর বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন অর্জনের উদ্দেশ্যে উচ্চপর্যায়ের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের যুক্তরাষ্ট্র সফর সম্পর্কে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করা হবে।
নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে চাল, গম, চিনি, ভোজ্যতেলসহ ৬৩টি নিত্যপণ্যের উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। বাজেট ঘোষণার এক মাস পেরিয়ে গেলেও এর সুফল বাজারে দেখা যায়নি, বরং কোনো কোনো পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে শুল্ক ও কর ছাড়ের সুবিধা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘরে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু শুল্ক-কর কমালেই বাজারে স্বস্তি ফিরবে না। আমদানি, উৎপাদন, মজুদ, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজার তদারকি আরো জোরদার করতে হবে। তা না হলে সরকারের দেয়া শুল্ক-কর ছাড়ের সুবিধা ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর বাজারগুলোতে দেখা গেছে, বেশির ভাগ সবজির দাম চড়া। বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা, গাজর ও টমেটো ১৪০ টাকা, করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ঝিঙা ও চিচিঙ্গা ৭০ থেকে ১০০ টাকা এবং পটোল ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ঢেঁড়স ৫০ থেকে ৭০ টাকা, পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ টাকা এবং শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি। ধনেপাতার দাম প্রতি কেজি প্রায় ৩০০ টাকা। কাঁচামরিচ বাজারভেদে ১৪০ থেকে ২৫০ টাকা।
তবে কাঁচামরিচের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। কয়েক দিন আগেও ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া কাঁচামরিচ ১৪০ থেকে ২৫০ টাকায় নেমেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি আমদানির কারণে দাম কমেছে।
ডিমের বাজারে স্বস্তি নেই। দুই সপ্তাহ আগে একডজন ডিম ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা দরে বিক্রি হলেও এখন তা ১৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। সাদা ডিম ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা এবং বাদামি ডিম ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা ডজন দরে বিক্রি হচ্ছে।
চালের বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সরু বা মিনিকেট চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা, মাঝারি মানের পাইজাম ও বিআর-২৮ চাল ৫৮ থেকে ৬৮ টাকা এবং মোটা স্বর্ণা বা চায়না ইরি চাল ৫৪ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে পোলাও ও সুগন্ধি চালের বাজারে স্বস্তি নেই। মানভেদে সুগন্ধি চাল ১৬০ থেকে ২৩০ টাকা এবং পোলাও চাল প্রায় ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চালের দাম কিছুটা কমলেও আটা-ময়দার বাজারে উল্টো চাপ রয়েছে। বর্তমানে খোলা আটা ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং প্যাকেটজাত আটা ৫৫ থেকে ৬২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। খোলা ময়দা ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা কেজি।
বাসাবো বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী সুজন বলেন, এক মাস ধরে আটার দাম বাড়তি। আগে দুই কেজি আটার প্যাকেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ছিল ১২০ টাকা। এখন কোম্পানিগুলো নতুন দর নির্ধারণ করে তা ১৩০ টাকা করেছে। একইভাবে দুই কেজি ময়দার প্যাকেট ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে।
খোলা সয়াবিন তেল বর্তমানে ১৭২ থেকে ১৮৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে। এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৮৯ থেকে ১৯৮ টাকা, দুই লিটারের বোতল ৩৭৮ থেকে ৩৯৫ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতল ৯২০ থেকে ৯৬৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
মাছের বাজারে স্বস্তির চিত্র নেই। চাষের পাঙাশ ২০০ থেকে ২৮০ টাকা, তেলাপিয়া ২২০ থেকে ৩০০ টাকা এবং রুই-কাতলা ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশী পাবদা, ট্যাংরা, শিং, মাগুর, শোল, চিতল ও বোয়াল ৫০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ছোট কাচকি মাছও ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি। ইলিশের দাম আরো বেশি। ৯০০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রায় দুই হাজার ৫০০ টাকা এবং ১ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রায় তিন হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
গরুর গোশত ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির গোশত এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা এবং দেশী মুরগি ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা।
ভোক্তারা বলছেন, শুধু শুল্ক ছাড় দিয়ে বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা কঠিন। শুল্ক কমানোর সুবিধা আমদানিকারক থেকে পাইকারি ও খুচরা পর্যায় পেরিয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে। শুল্ক কমিয়ে সরকার রাজস্ব হারালেও সেই সুবিধা যদি ব্যবসায়ী বা মধ্যস্বত্বভোগীরা নিয়ে নেন, তাহলে একদিকে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্য দিকে ভোক্তারও কোনো লাভ হবে না। তাই শুল্ক-কর ছাড়ের প্রকৃত প্রভাব বাজারদরে পড়ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।



