নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটিসহ বিদ্যমান টার্মিনাল এবং কমলাপুর আইসিডির কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কর্তৃত্ব সরকার সমর্থক একটি ব্যবসায়িক গ্রুপের হাতে নেয়ার আয়োজন চলছে এমন তথ্য মিলেছে। সরকারদলীয় দুই সংসদ সদস্য ফ্যাসিস্ট আমলের পুরো সময় জুড়ে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের একচ্ছত্র কর্তৃত্বে থাকা সাইফ পাওয়ার টেককে সাথে নিয়ে একটি কনসোর্টিয়াম করে এনসিটির কর্তৃত্ব নিতে চায়। এর বাইরে সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানও এনসিটি পরিচালনায় ইতোমধ্যে প্রস্তাবনা দিয়েছে। গেল সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে এনসিটি নিয়ে দরকষাকষি বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একদিনে দুই চিঠির সাথে বিষয়টির সংযোগ রয়েছে বলে বন্দর সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
বন্দর সূত্র জানিয়েছে, গত ২৮ এপ্রিল সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কনসোর্টিয়াম নামে সিসিটির অপারেটর সাইফ পাওয়ার টেকের মালিক তরফদার রুহুল আমিন, লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সরকার দলের সংসদ সদস্য ও হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজানের কসমস এন্টারপ্রাইজ এবং লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের প্রতিষ্ঠান এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস মিলে গঠিত কনসোর্টিয়াম নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে ১৫ বছরের জন্য টার্মিনালটি পরিচালনার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দেয়। তবে বিষয়টি জানাজানি হয় এক মাসের বেশি সময় পর।
এ ছাড়া সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে পরিচিত অপর প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপও এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে একই দিনে জমা দিয়েছে বলে সূত্র জানায়।
যদিও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আলোচনা চলমান অবস্থায় নতুন প্রস্তাবগুলো বিবেচনার সুযোগ নেই বলে সূত্র জানায়। সূত্র মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের সর্ববৃহৎ টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে গত ৪ জুন বৃহস্পতিবার একই দিনে নৌ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দু’টি চিঠির ভিন্ন বার্তায় দেশীয় একটি প্রেসার গ্রুপ টার্মিনালটি নিজেদের কব্জায় নিতে তৎপর কি না সে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
কি আছে মন্ত্রণালয়ের এক দিনের দুই চিঠিতে : গত বৃহস্পতিবার সকালে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, ‘অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স অব সিপিএস নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইনক্লুুডিং ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) বাই প্রাইভেট টার্মিনাল অপারেটর আন্ডার পিপিপি’ শীর্ষক পিপিপি প্রকল্পের আইটিও নিয়োগের লক্ষ্যে চলমান নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অথবা এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক না হলে, সে ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া বাতিল করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
একই দিনে বিকেলে আরেক চিঠিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ হতে উক্ত প্রকল্পের আইটিও নিয়োগের লক্ষ্যে দুবাইভিত্তিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড এফজেডইর সাথে নেগোসিয়েশন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এক দিনে একই বিষয়ে দুই ধরনের চিঠিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে এনসিটির ইজারা নিয়ে সরকার সিদ্ধান্ত হীনতায় ভুগছে কি না? শিপিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনসিটির বিষয়টি তিনটি সরকারের চলমান আলোচনা এবং দরকষাকষির একটি প্রক্রিয়া। যেহেতু সাত বছর আগে স্বাক্ষরিত জিটুজি এমওইউর আওতায় টার্মিনালটি ইজারার আলোচনা চলছে, ফলে সরকারের সরে আসার সুযোগ নেই। ফলে তাদের সাথে আলোচনা চলমান রেখে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব বিবেচনারও সুযোগ নেই। সেজন্য শাসকদলের একটি অংশ ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আলোচনা যাতে সফল না হয় সেজন্য তৎপর রয়েছে বলেও সূত্র জানায়। আর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আলোচনা সফল না হলে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা যাবে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডকে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া যেভাবে চলছে : লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের নামে দেশের ডলার সঙ্কট কাটাতে তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার সংযুক্ত আমিরাতকে চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনালসহ বন্দর খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দুবাইতে পিপিপি জিটুজি পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুবাই সরকারের পক্ষে ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পিপিপি কর্তৃপক্ষ এর মধ্যে এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়।
এ দিকে ২০২৪ এর জুলাই আগস্ট আন্দোলনের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেফতার বাংলাদেশীদের ছাড়াতে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা যখন ইউএই আমিরকে ফোন করেন তখন ওই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটি ইস্যুতে আবার সক্রিয় হয়ে উঠে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের অব্যবহিত পরেই ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ও সিইও সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়ে সে বছর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সাইড লাইনের দ্বিপক্ষীয় মিটিংয়ের প্রস্তাব দেন। সে অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ড চেয়ারম্যানের সাথে প্রধান উপদেষ্টার সাইড লাইন মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টাকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান এনসিটি প্রকল্পে তাদের আগ্রহ এবং ইতোমধ্যে পতিত সরকারের সময়ে সম্পাদিত জিটুজি এমওইউর কথা স্মরণ করিয়ে দেন বলে সূত্র জানায়। একই সাথে দুবাইয়ের বিশাল শ্রমবাজার এবং সেখানে থাকা প্রায় ৫ লাখ অবৈধ শ্রমিকের ইস্যুও সামনে আনা হয়েছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ৮ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে চতুর্থ বাংলাদেশ দুবাই জয়েন্ট পিপিপি প্লাটফর্ম মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বাংলাদেশের পক্ষে বিডার চেয়ারম্যান ও পিপিপি অথরিটির সিইও আশিক চৌধুরী এবং দুবাই সরকারের পোর্টস কাস্টমস অ্যান্ড ফ্রি জোনস করপোরেশনের সিইও নাছের আব্দুল্লাহ আল নিয়াদি নিজ নিজ পক্ষে নেতৃত্ব দেন। ডিপি ওয়ার্ল্ডের গ্রুপ সিইও যুবরাজ নারায়ণসহ ডিপি ওয়ার্ল্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা ওই সভায় যোগ দেন।
ওই সভায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষ হতে কনসেশন চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছরের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য বাংলাদেশের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। একটি সূত্র জানিয়েছে তারা ৩০ বছরের জন্য টার্মিনালটি নিতে চায়। এনসিটির জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ড (দরদাতা) একটি সংশোধিত দরপত্র জমা দিতেও সম্মত হয়। ওই সভায় এনসিটির পাশাপাশি সিসিটিও নিতে চায় ডিপি ওয়ার্ল্ড।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার ঘনিষ্ঠদের এসব প্রস্তাব এমন সময় সামনে আসল যখণ মন্ত্রণালয়ের দুই চিঠি নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে এনসিটি ইস্যুটি। সূত্র বলছে- আওয়ামী আমলে এনসিটি বিদেশীদের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হলেও এতদিন কোন দেশীয় প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক আগ্রহ দেখায়নি, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মাথায় সরকার দলীয় নেতারা বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কর্তৃত্ব নিতে আগ্রহী হয়েছেন। বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের প্রস্তাবের আড়ালে মূলত বিগত ১৭ ধরে আওয়ামী লীগ নেতাদের আশীর্বাদে বন্দরের একচ্ছত্র কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কর্তৃত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটির হাতেই তুলে দেবার আয়োজন।
নতুন কনসোর্টিয়াম প্রসঙ্গে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও কনসোর্টিয়ামভুক্ত এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের কর্ণধার শাহাদাত হোসেন সেলিম এমপি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা মনে করেছিলাম সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আলোচনা থেকে সরে এসেছে, সেজন্য আমরা একটি প্রস্তাবনা দিয়ে রেখেছিলাম। এখন যেহেতু সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আলোচনা চলমান রেখেছে সেজন্য আমাদের প্রস্তাবনাটাও সামনে নিয়ে আসলাম। ফ্যাসিস্ট আমলের সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানকে সাথে নিয়ে কেন কনসোর্টিয়াম এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- বাংলাদেশ আইন ও বিধি মোতাবেক অভিজ্ঞতার বিকল্প কিছু নেই। প্রতিষ্ঠানটি দক্ষতা অর্জন করেছে, আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা আছে, সবমিলিয়ে বাস্তবতার আলোকে এই কনসোর্টিয়াম হয়েছে। একজন সরকার দলীয় সংসদ সদস্য হিসেবে আপনি তো সরকারের পার্ট, সরকার যেখানে আলোচনা চলমান রেখেছে সেক্ষেত্রে আপনাদের প্রস্তাব দেয়াকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- চট্টগ্রাম বন্দরের বিধিবিধান ও পিপিআর অনুসারে চালু টার্মিনাল বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে দেয়ার সুযোগ নেই।



