রফিকুল হায়দার ফরহাদ (চর নিজাম) ভোলা থেকে ফিরে
‘আমরা কি দেশের জন্য কিছুই করছি না। এখানে বড় একটি ইলিশ মাছের ঘাট। আমাদের ঘাটে বেচাকেনা হওয়া ইলিশ যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে। রয়েছে শুঁটকি পল্লী। এখান থেকে শুঁটকি যায় সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে। আমাদের বন থেকে সংগৃহীত মধু দেশের বাইরেও রফতানি হচ্ছে। অথচ এরপরও কেন আমরা বেঁচে থাকার ন্যূনতম নাগরিক সুবিধাগুলো পাবো না।’ এই কথাগুলো চর কালকিনি বা চর নিজামের বাসিন্দা পল্লীচিকিৎসক শামীম, সাবেক যুবলীগ নেতা সালাহউদ্দিন, স্থানীয় ব্যবসায়ী কবির হোসেন এবং মোস্তাফিজ কাজীর। তাদের আফসোস, ‘এই চর নিজামে চমৎকার একটি সাদা বালুর সমুদ্রসৈকত আছে। কক্সবাজারের মতোই সেই বিচে ঝাউগাছ লাগানো। নতুন করে আরেকটি বিচে শত শত ঝাউগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। দৃষ্টিনন্দন এই দুই সমুদ্রসৈকত। অথচ পর্যটকরা জানেনই না এখানে যে এত সুন্দর সমুদ্রসৈকত আছে। ফলে কোনো পর্যটকই আসে না এখানে।’ ভোলার চর পাতিলা, মাঝের চর এবং আনোয়ারার চর হয়ে সন্ধ্যায় যখন পৌঁছালাম এই চর নিজামে তখন আমাকে পেয়েই অভিযোগগুলো করে গেলেন তারা। তাদের মতে, আমিই প্রথম মিডিয়াকর্মী যে এই চরে এসেছি।
বাংলাদেশের মানচিত্রে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে চোখ রাখলেই দেখা মিলবে এই চর নিজামের। বঙ্গোপসাগরের বুকে ঢাল চর ও নিঝুম দ্বীপের মাঝে মেঘনা নদীর মোহনায় এই চর নিজামের অবস্থান। স্থানীয়রা এই চরকে চর কালকিনি বলে ডাকে। তবে ম্যাপে উল্লেখ আছে চর নিজাম নামে। স্থানীয় খাবার হোটেলের ব্যবসায়ী হোসেন জানান, মানুষের যেমন ডাক নাম আর আসল নাম থাকে চর নিজাম এবং চর কালকিনি ঠিক সে রকমই। ম্যাপে এই চরের নাম চর নিজাম। তবে আমাদের কাছে চর কালকিনি নামেই পরিচিত।’
এই চর নিজাম নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়েছিল আমাকে। গত বছর কুকরি মুকরির জাকির মাঝি ও আখতার মাঝি আমাকে চর নিজাম বলে নিয়ে গেলেন পূর্ব ঢাল চরে। সেখানে মসজিদের সাইনবোর্ডে লেখা আছে পূর্ব ঢাল চর মসজিদ। তখন পূর্ব ঢাল চরের মানুষও বললেন এই পূর্ব ঢাল চরকে কেউ কেউ চর নিজাম বলে ডাকে। এবার চর কালকিনির লোকজনও বললেন, পূর্ব ঢাল চরও অনেকের কাছে চর নিজাম নামে পরিচিত।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন ১৯৭০ এর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের আগে থেকেই এই চর নিজামে লোকবসতি শুরু। যেহেতু এই চরের অবস্থান বঙ্গোপসাগরের মাঝে তাই এখান থেকে বিভিন্ন দিকেই যাওয়া যায়। তবে চরবাসীর মূল যোগাযোগ ভোলার চর ফ্যাসনের সাথে। পূর্ব উত্তরের নিঝুম দ্বীপের চেয়ে কাছে পশ্চিমের চর ফ্যাসন। তাই শিক্ষা, চিকিৎসা, বাজার করা সবই তাদের চর ফ্যাসনকেন্দ্রিক। তাছাড়া নিঝুমদ্বীপ চর নিজামের মতোই অনুন্নত। ট্রলারে চর নিজাম থেকে চর ফ্যাসনে যেতে লাগে তিন ঘণ্টার মতো। নদী- সাগর পেরিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই ট্রলারে যাতায়াতই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্বীপবাসীর জন্য। বিশেষ করে মারাত্মক অসুস্থদের জন্য এই জলপথ পাড়ি দেয়া অনেক কষ্টের। অনেকেই ওই নৌপথে যেতে যেতেই মৃত্যুবরণ করেন। সপ্তাহে তিন দিন চর নিজাম থেকে ট্রলার যাওয়া আসা করে চর ফ্যাসনে। ওই সময়ে ট্রলারে গেলে খরচ কম। তা না হলে ৩-৪ হাজার টাকা ভাড়া করে যেতে হয়। স্পিডবোটে দ্রুত যাওয়া গেলেও ভাড়া লাগে ৬-৭ হাজার টাকা।
শুধু শুকনো মৌসুমেই চরের লোকদের ট্রলারে যাতায়াতটা স্বস্তির। বর্ষায় এবং ঝড়ের সময় এই পথ আর পাড়ি দেয়া সম্ভব হয় না। বিশাল বিশাল ঢেউ থাকে। তখন বিনা চিকিৎসায়ই ঘরে বসে মৃত্যু বরণ করতে হয় এলাকাবাসীকে। স্থানীয় পল্লীচিকিৎসক শামীম জানান, প্রতি মাসেই ৪-৫ জন করে বিনা চিকিৎসায় মারা যান চর নিজামের মানুষ। কয়েক দিন আগে একজন নারী স্ট্রোক করে এখানেই মারা গেছেন। তাকে নেয়ার মতো কোনো সুযোগ ছিল না। সময়ও পাওয়া যায়নি।
শামীম আরো তথ্য দেন, চিকিৎসার কোনো সুযোগ সুবিধা নেই এই চর নিজাম বা চর কালকিনিতে। এই চরে ডাক্তার বলতে আমি একাই। রয়েছে কয়েকটি ওষুধের দোকান। আমি এবং অন্য ওষুধের দোকান থেকেই প্রাথমিক চিকিৎসা পান স্থানীয়রা। গুরুতর হলে তাদের চর ফ্যাসনে যাওয়ার পরামর্শ দেই।’ এরপর যোগ করেন, ‘তবে বললেইতো আর যাওয়া যায় না চর ফ্যাসনে। ট্রলারে সময় লাগে বেশি। আবার স্পিডবোটে যেতে গুনতে হয় ৬-৭ হাজার টাকা।’ আরো বললেন, ‘এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা নদী ও সাগরে মাছ ধরা। পরিবারের সবাই মাছ ধরে। ধরুন কোনো পরিবারের সব পুরুষ সদস্যই গেলেন সাগরে মাছ ধরতে। এই সময়ে তাদের ঘরের গর্ভবতী স্ত্রীর প্রসববেদনা শুরু হয়েছে, যাকে হাসপাতালে নিতে হবে। ওই মুহূর্তে তার স্বামীর পক্ষে যেমন তাৎক্ষণিক সাগরে থেকে আসা সম্ভব নয়, তেমনি দ্রুত হাসপাতালে নেয়ারও উপায় থাকে না। সব গুছিয়ে যেতে যেতেই ৫-৬ ঘণ্টা লেগে যায়। এতে ওই গর্ভবতীর যেমন মৃত্যু হতে পারে তেমনি ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুটিও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে।’ ৩৫ বছর আগে এই চর নিজামে এসে বসতি গড়া ব্যবসায়ী মোস্তাফিজ কাজী জানালেন, ‘এই চরে গর্ভবতী মা এবং নবজাতক শিশুর মৃত্যু নিত্য ঘটনা।’
সাগরের সাথে সংযোগ করা খালের ধারে চর নিজামের মাছের ঘাট। আমরা যখন সন্ধ্যার সামান্য আগে সেখানে পৌঁছালাম তখন জেলেদের আসা শুরু হয়েছিল সাগর থেকে। ইলিশ মাছই বেশি ছিল তাদের কাছে। সাথে পোয়া মাছ অল্প কিছু। মূল মাছের নিলাম শুরু হয় সকাল ৮টার পর। সন্ধ্যায় সামান্য পরিমাণ। তাই ওই সময়ে স্থানীয়রা অন্য কোনা কাজই হাতে রাখে না। ওই মাছের ঘাট থেকে নতুন বাজারে যাওয়ার রাস্তাটা একেবারেই ব্যবহার অনুপোযোগী। খালের পাড়ে মাটির এই রাস্তা ভেঙে গেছে। কোনো বাহন যাওয়াতো দূরের কথা, পায়ে হেঁটে চলতেও খুব সতর্ক থাকতে হয়। ওই খালে মাছ ধরা ট্রলারগুলো নোঙর করে। সন্ধ্যায় দেখলাম এক ব্যক্তি ওই খাল পার হচ্ছে মাথার উপর লুঙ্গি ও শীতের কাপড় হাতে ধরে। বুক পরিমাণ পানি পেরিয়ে তিনি যখন পাড়ে এলেন তখন দেখলাম তার পরনে গামছা। শীতের মধ্যেই এভাবে তাকে পার হতে হচ্ছিল। তিনি খালের ওপারে উঁচু ঘরের উপর অনেকগুলো ভেড়া ও ছাগল রেখে এসেছেন। শিয়াল এবং জোয়ারের পানি থেকে রক্ষা করার জন্য ভেড়াগুলো উঁচু মাচা ঘরে রাখা হয়। আলম ব্যাপারী নামের এই ব্যক্তি বললেন, কী আর করব। এই খালেতো কোনো ব্রিজ নেই। নেই সাঁকো। ফলে আমাদের দিনে এভাবেই কয়েকবার ভিজে ভিজে পার হতে হয়।
খালের পাড়ের রাস্তায় গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি সাঁকোতে খুব সাবধানে পার হয়ে নতুন বাজারে গেলাম। ৫-৭ মিনিট লাগলো। সেখানে দারুণ একটি মসজিদ। সাথে খোলা মাঠ। ডা: শামীম জানান, ‘স্থানীয়রা মিলেই ২৫ লাখ টাকায় এই নতুন বাজার জামে মসজিদটি নির্মাণ করেছেন।’ আমি সেখানে জামায়াতে মাগরিবের নাজাম আদায় করলাম। বাজারে তখন প্রচুর মানুষের উপস্থিতি। সারা দিন কাজ শেষে এই চরের মানুষজন সন্ধ্যায় বাজারে আসে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাকাটা করে। হোটেলে আড্ডা দেয়া আর সাথে চা-বিস্কুট, পুরি, শিঙ্গাড়া খাওয়া। একটি দোকানে ঢুকে আমরাও নাশতার পর্ব শেষ করলাম।
সেখানে হোটেল মালিক হোসেন জানান, ‘আমাদের এই চরে শিক্ষাব্যবস্থা একেবারেই খারাপ। একটি মাত্র প্রাইমারি স্কুল আছে। একটি নুরানী মাদরাসা। ১৯৮৮ সালে আমার জন্ম এই চরে। কোনো মাধ্যমিক স্কুল তখনও ছিল না, এখনই নেই। ফলে আমি ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পঞ্চম শ্রেণীর বেশি আর পড়তে পারিনি।’ চরের অন্য ছেলেমেয়েদেরও এর বেশি লেখাপড়া করার সুযোগ নেই। কোনো বাবা-মা যদি তার সন্তানকে লেখাপড়া করাতে চান তাহলে ওই দক্ষিণ আইচা, লাল মোহন ও চর ফ্যাসনে পাঠান। সেখানে তারা হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করে। এতে খরচ প্রচুর, বললেন হোসেন। পাশে থাকা ব্যবসায়ী কবির যোগ করেন, ‘আমাদের এই চর নিজামে চমৎকার একটি সমুদ্রসৈকত আছে। কিন্তু কারো কাছেই এই সমুদ্রসৈকতের পরিচিতি নেই। তাই তেমন কোনো পর্যটকই আসে না। শুধু বিশ^বিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রের একটি গ্রুপ আসে। তারা ক্যাম্প করে থাকে। অন্য কেউ এলে আমরা মাছের আড়তের গদিঘর ছেড়ে দেই। সেখানেই থাকে। গদিঘর লাগোয়া টয়লেটও আছে।’ এরপর বলেন, ‘আপনি প্রথম সাংবাদিক এই চরে এলেন। আশা করি আপনার মাধ্যমে পর্যটকরা জানবেন এই চর সম্পর্কে। তখন তারা ব্যাপক ভাবে আসবেন। এতে আমরাও আর্থিকভাবে লাভবান হবো। পর্যটকরাও চরের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। সে সাথে যদি আমাদের এই চরের চিকিৎসা সমস্যাগুলো তুলে ধরেন তাহলে সরকারও স্বাস্থ্যসেবা খাতে আমাদের জন্য কিছু করবে।’
চর নিজামে একটিমাত্র সাইক্লোন শেল্টার। এর ধারণক্ষমতা ২০০ জনের। অথচ এই চরে ৫-৭ হাজার লোকের বাস। ১৯৯১ সালের ঝড়ে এই চরের শতাধিক লোক মারা গিয়েছিল। এ ছাড়া পরের অন্য বড় সামুদ্রিক ঝড়গুলোতে প্রতিবারই ৫-৬ জন করে লোক মারা গেছে। তথ্য দেন মোস্তাফিজ কাজী। তার দাবি, সরকার যেন এই চরে আরো সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করে দেয়। তাহলে ঝড়ের সময় স্থানীয়রা সেখানে আশ্রয় নিতে পারবে।’
আমরা এই চরে পৌঁছার সময়ই দেখলাম পশ্চিম দিকের অংশ ভেঙে যাচ্ছে। বড় বড় নারিকেল গাছ কাত হয়ে পড়ে পানির নিচে চলে গেছে। মোস্তাফিজ কাজীর অনুরোধ- সরকার যেন এই চরের চার পাশে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে দেয়। তাহলে রক্ষা পাবে ভূমি।
ঝড়ে এই চরের মানুষ যেমন অসহায়, এর চেয়ে বেশি দুরবস্থায় পড়ে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার পাল। জলোচ্ছ্বাসে হাজার হাজার গরু মহিষ ভেসে যায়। আমার সাথে যখন মোস্তাফিজ কাজী কথা বলছিলেন তখন তার পাশে থাকা এক ব্যক্তি তথ্য দেন, ‘আগের এক বছর ঝড়েতো লাইন ধরে কয়েক শ’ গরু ও মহিষ সাগরে ভেসে গেছে। এর মধ্যে এক পরিবারেরই ছিল শতাধিক গরু ও মহিষ।’ ঝড়ের সময় এই গবাদিপশুগুলোকে রক্ষা করার জন্য সরকারের কাছে কিল্লা নির্মাণের দাবি এলাকাবাসীর। কিল্লা মানে মাটি দিয়ে ১০-১২ ফুট উঁচু স্থান নির্মাণ করা। কয়েক বিঘা জমি ওপর যদি বেশ কয়েকটি কিল্লা নির্মাণ করা যায় তাহলে গরু-মহিষগুলো ঝড়ের সময় এখানে রাখা যাবে। রক্ষা করা যাবে পানিতে ভেসে যাওয়া থেকে।
আমাদের বলা হলো সকালে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে থাকা সাদা বালু আর ঝাউগাছে ঢাকা সেই সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার জন্য। আধাঘণ্টা হাঁটলেই যাওয়া যাবে সেখানে। তবে খুব সকালেই আমাদের যেতে হবে তিন ঘণ্টা দক্ষিণ দিকে বঙ্গোসাগরের বুকে জেগে থাকা ৬৫-এর চরে। কারণ জোয়ার থাকতে থাকতে রওনা হয়ে ভাটার সময় সেখানে যেতে হবে। অবশ্য ভোরবেলা থেকেই প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বাতাস বইছিল। সাথে কুয়াশাও ছিল। তাদের সেই অনুরোধ রাখতে পারিনি। তা ছাড়া অচেনা জায়গায় যাওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও প্রচণ্ড বাতাসের কারণে আমাদের ৬৫-এর চরের উদ্দেশে রওনা হওয়াটাও দেরিতে করতে হয়েছিল। অবশ্য ভোরবেলায় সূর্য ওঠার আগেই দেখলাম কয়েকটি ট্রলার মাঝ ধরার জন্য সাগরের উদ্দেশে ছুটে গেল। ওদের জন্য এমন বাতাস ভয়ের কোনো কারণই নয়।
এই কালকিনির চর বা চর নিজাম এক সময় ডাকাতদের আখড়া ছিল। উপকূলীয় এলাকার অন্য চরগুলোতে গিয়ে এই চর কালকিনির ডাকাতের কাহিনী শুনেছি। এই কালকিনির ডাকাতরাই দাবড়িয়ে বেড়াতো পুরো বঙ্গোপসাগরে। তাই আমাদের ভয়ও হচ্ছিল। মাঝি হোসেনও বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন সন্ধ্যার আগেই পৌঁছাতে হবে চর নিজাম বা চর কালকিনিতে। তবে চর কালকিনিবাসী জানান, ২০০৪ সালের আগে এই চরে ডাকাতের উৎপাত ছিল। ওরা ছিল খুলনা থেকে আসা ডাকাত। এরা সাগরে ডাকাতি করত। পরে এই চরে এসে আশ্রয় নিতো। তাদের হাতে এই চরের একজন খুন হয়। পরে এখানে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প হওয়ার পর সেই ডাকাতরা পালিয়েছে। তবে ২০২১ সালে এই চর থেকে পুলিশ ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে চরের লোকজন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছেন। জানান ব্যবসায়ী হোসেন। তার মতে, আমরা অনেক অনুরোধ করেছিলাম এখানে পুলিশের ক্যাম্পটি রাখতে। কিন্তু শুনেনি কর্তৃপক্ষ।
চর নিজামের বনে শিয়াল, মহিষের সাথে হরিণও আছে। রয়েছে সাপ ও নানান জাতের পাখি। তবে বানর নেই বলে জানান স্থানীয়রা। একটি হরিণ বন থেকে এসে বাজারে ঘুরে বেড়ায়। যে যা হাত পেতে দেয় তাই খায় এই হরিণ। ঠিক গরু-ছাগলের মতোই। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় আমাদের পক্ষে সেই হরিণ দেখার সুযোগ হয়নি। দূরে থাকা বন বিভাগের অফিসেও যাওয়া হয়নি।
রাতে মাছের আড়তের গদিতে আমাদের থাকার জন্য অনুরোধ করলেন স্থানীয়রা। ওই গদিঘরের সাথে টয়লেটও আছে। তবে মাঝি হোসেনের পরামর্শে রাতে ট্রলারেই থাকলাম। কারণ সকালে জোয়ারের কারণে ঘাটের ওই স্থান থেকে ট্রলার ছাড়তে সমস্যা হবে মাঝির। রাতে এসে স্থানীয়রা খোঁজ নিয়েছেন ঠিক মতো ট্রলারে আছি কি না।
রাতে ট্রলারে থাকার জন্য ওঠার আগে একটি চিংড়ি, তিনটি পোয়া মাছ ও দু’টি রামসুস মাছ কিনলাম একশত টাকায়। অবশ্য ওই মাছগুলো এক জেলে খাওয়ার জন্য নিচ্ছিলেন। তার কাছ থেকে অনুরোধ করেই মাছগুলো কিনলাম। মাছের নিলাম বা ডাকের সময় ছোট সাইজের ইলিশ মাছগুলো আলাদা করা হয়। এগুলো আর কেনা হয় না। যে জেলে মাছ ধরে এনেছে তাকে খাওয়ার জন্য দেয়া হয় এই মাছগুলো।
আমরা সকালে ৬৫-এর চরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় কিছু সময়ের জন্য ছোট ঝাউগাছের সাদা বালুর বিচে গেলাম। গাছগুলো ৩-৪ ফুট লম্বা। বেশি দিন হয়নি লাগানো হয়েছে। লাইন ধরে বিচের ওপর লাগানো। দৃষ্টিনন্দন এই বিচ। কয়েক মাইল লম্বা হবে এই বিচের দৈর্ঘ্য। সকালে ওঠা সূর্যের মিষ্টি উত্তাপ আর বয়ে যাওয়া ঠাণ্ডা বাতাস বেশ উপভোগ্য। আমরা বিচে নামার পরপরই দেখলাম একটি হরিণ হেঁটে গেছে বালুর উপর দিয়ে। হরিণের পায়ের খুরার স্পষ্ট ছাপ। বিচের উপর বড় একটি অংশজুড়ে মরা কচুরিপানা। জোয়ারের সময় ঢেউয়ের তোড়ে এখানে এসে ঠেকেছে। ঝাউগাছের পেছনে সবুজ প্রান্তর। সেখানে গরু, মহিষ ও ভেড়া ঘাস খাচ্ছিল। এই সবুজ প্রান্তরের পেছনে কেওড়া বন। সমুদ্রসৈকতের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের বেশ কিছু গাছ মরে গেছে। সেই গাছের গুঁড়ি বিচ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। দূরে বসা ছিল বকের সারি। আর বন থেকে ভেসে আসছিল ঘুঘু পাখির ডাক। নীরব প্রান্তরে অনেক দূর থেকেও শব্দ ভেসে আসে। বহু কষ্টে এই চরের সৌন্দর্যের মায়া কাটিয়ে ছুটলাাম ৬৫-এর চরের উদ্দেশে।



