‘স্যার, আমি চাকরি ছেড়ে দিতে রাজি আছি, কিন্তু এ কাজ করতে পারব না এবং আমাকে দিয়ে জোর করে কেউ করাতেও পারবে না’ সাবেক পুলিশ সুপারের ‘ক্রসফায়ারের’ নির্দেশের জবাবে এভাবেই নিজের কঠোর আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন পুলিশ পরিদর্শক অসীম কুমার সিকদার। ২০১৫ সালে বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ছাত্রদল ও জাসাস নেতাকে কথিত ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ প্রথম সাক্ষী হিসেবে দেয়া জবানবন্দীতে তিনি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। শুনানির প্রথম দিনেই রাষ্ট্রপক্ষে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর শহিদুল ইসলাম সরদার। এরপর প্রথম সাক্ষী হিসেবে পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) অসীম কুমার সিকদারের জবানবন্দী গ্রহণ পরিচালনা করেন প্রসিকিউটর এস এম তাসমিরুল ইসলাম।
এর আগে গত ২০ মে শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল-২। একই সাথে সূচনা বক্তব্য ও রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য গতকালের দিনটি ধার্য ছিল।
মামলার বিবরণী অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের শিকার দুই ব্যক্তি হলেন আগৈলঝাড়া উপজেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং উপজেলা জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা। প্রসিকিউশনের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, টিপু ও কবির তৎকালীন এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয় এবং তৎকালীন এসপি এ কে এম এহসান উল্লাহকে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি উজিরপুর থানা পুলিশ তাদের একটি মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে। পরে তৎকালীন এএসআই মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিনকে দিয়ে গৌরনদী-গোপালগঞ্জ হাইওয়ের আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের পাশে তাদের কথিত বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হয়।
আদালতে দেয়া পূর্ণাঙ্গ জবানবন্দীতে তৎকালীন আগৈলঝাড়া থানার এসআই এবং বর্তমানে বরিশাল সদর নৌথানার ওসি অসীম কুমার সিকদার জানান, ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে বুধার সাকিনের বাইপাস মহাসড়কে একটি ফলবাহী পিকআপ ভ্যানে (খুলনা মেট্রো-ন-১১-০৮৩৩) অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। তৎকালীন পুলিশ সুপার এ কে এম এহসান উল্লাহর নির্দেশে এবং আগৈলঝাড়া থানার তৎকালীন ওসির চাপে বাধ্য হয়ে তিনি নিজে বাদি হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি টাইপ করা ভুয়া এজাহারে স্বাক্ষর করেন। মামলা রুজু হওয়ার পর থেকেই আসামিদের ধরার জন্য পুলিশ সুপার তীব্র চাপ সৃষ্টি করেন এবং ১২ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নজরুল ইসলামকে আসামি ধরতে ঢাকায় পাঠান।
সাক্ষী আরো বলেন, ‘২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টায় তৎকালীন এসপি আগৈলঝাড়া থানায় এসে ওসির কক্ষে আমাকে ডেকে পাঠান। সেখানে তিনি আমাকে বলেন যে, ঢাকা থেকে গ্রেফতারকৃত দুই আসামিকে নিয়ে আসা হচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাদের ক্রসফায়ার দিতে হবে। এই কাজ আমাকেই করতে বলা হয়। আমি এতে অস্বীকৃতি জানালে এসপি এ কে এম এহসান উল্লাহ ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে চরম গালিগালাজ করেন, প্রমোশন আটকে দেয়া এবং এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) নষ্ট করাসহ ক্যারিয়ার ধ্বংসের হুমকি দিয়ে কক্ষ থেকে বের করে দেন।’ জবানবন্দীতে তিনি বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে মনে-প্রাণে ঘৃণা করতেন বলেই তিনি এই আদেশের কঠোর প্রতিবাদ করেছিলেন। পরবর্তীতে থানার অন্য অফিসারদের ডাকলেও কেউ এই অবৈধ নির্দেশে রাজি হননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে এসপি সেন্ট্রি ও ডিউটি অফিসার বাদে সবাইকে থানা থেকে ডিউটিতে বের করে দেয়ার নির্দেশ দেন।
হত্যাকাণ্ডের রাতের বিবরণ দিয়ে জবানবন্দীতে সাক্ষী বলেন, ‘২১ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক ১টার দিকে ওসির নির্দেশে আমি, এসআই মোস্তাফিজ ও এসআই মনোরঞ্জন ফোর্সহ উত্তর দিকের বাইপাস ব্রিজে ডিউটিতে ছিলাম। রাত ২টার দিকে এসপির গাড়ি আমাদের অতিক্রম করে বুধার এলাকার দিকে যায়, যার পেছনে একটি মাইক্রোবাস ছিল। এর কিছুক্ষণ পর, রাত আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিটে বাইপাস ব্রিজ থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে আমরা কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনি এবং আগুনের শিখার মতো দেখতে পাই।’
তিনি আরো জানান, ‘পরদিন সকালে থানার ওসি আমাদের নিশ্চিত করেন যে, রাত ২টা ১৫ মিনিটে গ্রেফতারকৃত ছাত্রদল নেতা মো: টিপু হাওলাদার ও জাসাস নেতা মো: কবির হোসেনকে ক্রসফায়ার দেয়া হয়েছে। থানার কোনো অফিসার রাজি না হওয়ায় এসপি পাশের উজিরপুর থানা থেকে এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিমকে এনে এই হত্যাকাণ্ড ঘটান। পরবর্তীতে নিহতদের জীবিত অবস্থায় থানায় হাজির না করা হলেও, এসপির নির্দেশে তাদের নথিপত্র ও জিডিতে থানায় হাজির এবং অভিযানে অংশ নেয়ার ভুয়া তথ্য প্রদর্শন করা হয়েছিল।’
এই মামলায় বর্তমানে উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। অন্য দিকে, বরিশাল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসান উল্লাহ পলাতক রয়েছেন।



