নিজস্ব প্রতিবেদক
- পরিকল্পনার দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতাকেই দায় দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা
সকালের ভারী বৃষ্টিতে গতকাল আবারো ডুবেছে পুরো রাজধানী। মূল সড়কের পাশাপাশি নিম্নাঞ্চলের সড়কগুলো হাঁটু পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে শুক্রবার ছুটির দিনে বাজারসহ ব্যক্তিগত কাজে বাইরে বের হওয়া মানুষের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
রাজধানীতে বর্ষা এলেই যেন উন্নয়নের সব দাবি ভেসে যায় বৃষ্টির পানিতে। গত এক দশকে জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ উন্নয়ন, পাম্পিং স্টেশন নির্মাণ, বক্স কালভার্ট সংস্কার ও সড়ক উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাস্তবে বর্ষা এলেই রাজধানী পরিণত হয় অস্থায়ী জলনগরীতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনার দুর্বলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের ত্রুটি, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা, খাল-জলাশয় দখল এবং প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কাক্সিক্ষত সুফল মিলছে না।
সকালের বৃষ্টিতে মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, কালশী, ধানমন্ডি-২৭, গ্রিন রোড, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মতিঝিল, ফকিরাপুল, পল্টন, মালিবাগ, মগবাজার, শান্তিনগর, বাসাবো, খিলগাঁও, নিউমার্কেট, কাওরানবাজার, সায়েদাবাদ, ধলপুর, শনিরআখড়া ও হাতিরঝিলসহ রাজধানীর বহু এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। কোথাও রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে, কোথাও দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়। অনেক এলাকায় ম্যানহোলের ঢাকনা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
নগরবাসীর অভিযোগ, প্রতি বছর একই এলাকায় জলাবদ্ধতা হলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না। বরং নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা এলেও দুর্ভোগ কমার পরিবর্তে বাড়ছে।
জুমার নামাজের পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো: শফিকুল ইসলাম খান মিরপুর-১০, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া এলাকায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। তিনি পানির মধ্যে নেমে ড্রেন ও পানি নিষ্কাশনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত পানি অপসারণের নির্দেশ দেন। এ সময় তিনি স্থানীয় দোকানদারদের ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা না ফেলার আহ্বান জানান। পরে মিরপুর-১২ নম্বরের ৬ নম্বর কাঁচাবাজার পরিদর্শন করে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের দ্রুত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।
‘জলাবদ্ধতা এখন নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্কট’
সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আয়োজিত এক সেমিনারে নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতা এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি দীর্ঘদিনের নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। তাদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল ও জলাধার ভরাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বল্পসময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার অনেক ড্রেনের সাথে কার্যকর খাল সংযোগ নেই। আবার বহু বক্সকালভার্ট বর্জ্যে ভরে থাকায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না। তার মতে, খাল ও জলাধারকে প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পুনরুদ্ধার, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার এবং সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
ব্যয় বেড়েছে, ফল মেলেনি
জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অন্যতম বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প ২০১৬ সালে শুরু হয়। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ২০২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এবং মেয়াদ ছিল ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত। পরবর্তীতে একাধিকবার প্রকল্প সংশোধন করে ব্যয় বাড়িয়ে এক হাজার ৭১৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। একই সাথে কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সড়ক, ফুটপাথ, ড্রেনেজ, এলইডি স্ট্রিটলাইট, পার্ক, খেলার মাঠ, কবরস্থান, কসাইখানা, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আবাসন এবং নগর ভবনের উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যদিও প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় শতভাগ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, বাস্তবে অনেক এলাকায় এখনো উন্নয়নকাজ চলমান এবং বর্ষা এলেই প্রকল্প এলাকার অনেক স্থানেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
হারিয়ে গেছে প্রাকৃতিক ড্রেনেজ
রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮৮৮ থেকে ২০২২ সালের তথ্য বিশ্লেষণে ঢাকার প্রায় ১২০ কিলোমিটার খাল হারিয়ে গেছে। অনেক খাল দখল, ভরাট কিংবা বক্স কালভার্টে রূপান্তরের কারণে প্রাকৃতিক প্রবাহ হারিয়েছে। একসময় এসব খাল ও জলাভূমির মাধ্যমে বৃষ্টির পানি বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে চলে যেত। বর্তমানে সেই স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বৃষ্টির পানি নগরীর ভেতরেই আটকে যাচ্ছে।
গবেষণায় রূপনগর, বাউনিয়া, বাইশটেকী, সাংবাদিক কলোনি, কল্যাণপুর ও পান্থপথ খালসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খালের সঙ্কোচন বা কার্যকারিতা হারানোর বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খালকে বক্স কালভার্টে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, রক্ষণাবেক্ষণও কঠিন হয়ে পড়েছে। ভেতরে বর্জ্য জমলেও সহজে পরিষ্কার করা যায় না। ফলে পানি নিষ্কাশন আরো ধীর হয়ে যায়।
১০৩টি জলাবদ্ধতার হটস্পট
বর্তমানে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হলেই রাজধানীর ১০৩টি জলাবদ্ধতার হটস্পট সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় রয়েছে ৬৫টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩৮টি।
২০২০ সালের শেষে ঢাকা ওয়াসা থেকে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হলেও এখনো প্রয়োজনীয় জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পৃথক ব্যবস্থাপনা কাঠামো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ড্রেনেজ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী এ কে এম শহিদ উদ্দিন বলেন, শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ বা পুরনো ড্রেন পরিষ্কার করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেন, খাল ও ড্রেনে বর্জ্য ফেলা, দখল এবং অপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে। অন্য দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো: বোরহান উদ্দিনের মতে, রাজধানীর জলাবদ্ধতা কমাতে আরো পাম্পিং স্টেশন, উন্নত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, কার্যকর ক্যাচপিট এবং আশপাশের নদ-নদীর পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, রাজধানীর জলাবদ্ধতা কেবল ড্রেনের সমস্যা নয়; এটি নগর পরিকল্পনার দীর্ঘদিনের সঙ্কট। প্রকল্পের পর প্রকল্প গ্রহণের পরিবর্তে খাল, ড্রেন, জলাধার ও নদীর মধ্যে প্রাকৃতিক সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে প্রতি বর্ষাতেই ঢাকাবাসীকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।



