বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনন্য জলাভূমি হাওর অঞ্চল প্রতি বছরই আগাম ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে পড়ে ব্যাপক কৃষি ক্ষতির মুখোমুখি হয়। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বল্পমেয়াদি বোরোধান চাষে সফলতা পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। এতে বন্যা শুরুর আগেই ধান ঘরে তোলা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
গতকাল সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো: হাবিবুর রহমান প্রামাণিক। এ সময় সহযোগী গবেষক অধ্যাপক ড. ইসরাত জাহান শেলীসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
গবেষকরা জানান, দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো মৌসুমে, যার মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ উৎপন্ন হয় হাওরাঞ্চলে। তবে প্রতি বছর আগাম বন্যায় হাওরের ধানক্ষেতে ১০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়ে থাকে। ফলে কৃষকেরা শেষ মুহূর্তে এসে ফসল ঘরে তুলতে পারেন না, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
অধ্যাপক প্রামাণিক বলেন, হাওরের ভূপ্রকৃতিগত অবস্থানের কারণে এপ্রিলের শেষ ভাগ থেকে মে মাসের শুরুতেই বন্যার পানি ঢুকতে শুরু করে। গত ৩৬ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মে মাসে বন্যার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি (প্রায় ৫০ শতাংশ), এপ্রিলের শেষার্ধে প্রায় ৪২ শতাংশ। তাই এপ্রিলের মাঝামাঝির আগেই ধান কাটতে পারলে ক্ষতির ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০২০ সাল থেকে হাওরে স্বল্পমেয়াদি বোরোধান চাষের গবেষণা শুরু করা হয়। প্রচলিত দীর্ঘমেয়াদি ধানের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি জাত ব্যবহার করলে ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই ফসল কাটা সম্ভব বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
তিনি আরো বলেন, হাওরে বহুল চাষকৃত ব্রি ধান-৯২ এর জীবনকাল প্রায় ১৬০ দিন, যা কাটতে বৈশাখের মাঝামাঝি সময় লাগে- ঠিক তখনই বন্যা শুরু হয়। এর পরিবর্তে ব্রি ধান-৮৮, ব্রি ধান-১০১, ব্রি ধান-১১৩, ব্রি ধান-১০৫ ও ব্রি ধান-২৫ এর মতো স্বল্পমেয়াদি জাত (প্রায় ১৪৫ দিন) চাষ করলে একই সময় রোপণ করেও অন্তত ১৫ দিন আগে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব।
গবেষণার মাঠপর্যায়ের ফলাফলে দেখা গেছে, ২৬ ডিসেম্বর রোপণ করা ব্রি ধান-৮৮ এপ্রিলের ৮ তারিখেই কাটা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া অষ্টগ্রাম ও ইটনা এলাকায় জানুয়ারির প্রথমদিকে রোপণ করা স্বল্পমেয়াদি জাতগুলো এপ্রিলের মাঝামাঝির মধ্যেই কর্তন করা গেছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি জাত তখনো পরিপক্ব হয়নি।
হাওরে বোরোধান চাষে তাপমাত্রা, শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টিও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন গবেষকরা। থোড় আসার সময় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে বা ফুল আসার সময় ৩৫ ডিগ্রির বেশি হলে ধান চিটা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তবে স্বল্পমেয়াদি ধানে কিছুটা কম ফলন হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে অনীহা দেখা যায় বলে জানান অধ্যাপক প্রামাণিক। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ধানে বেশি ফলন হলেও বন্যায় সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেশি- এ বিষয়টি অনেক কৃষক গুরুত্ব দিতে চান না।
গবেষকরা আরো জানান, এপ্রিলের প্রথমার্ধে ধান কাটতে হলে অবশ্যই ১০ জানুয়ারির মধ্যে চারা রোপণ সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি হাওরাঞ্চলে দ্রুত চারা রোপণ ও ফসল কাটার জন্য কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক প্রামাণিক বলেন, ‘রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, হার্ভেস্টারসহ আধুনিক কৃষিযন্ত্র সহজলভ্য হলে স্বল্পসময়ে সমন্বিতভাবে ফসল রোপণ ও কর্তন করা সম্ভব হবে, যা বন্যা ঝুঁকি মোকাবেলায় অত্যন্ত কার্যকর।’



