বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতের ‘পুশইন’ অভিযান, বাড়ছে ধর্মীয় উত্তেজনা

আলজাজিরার অনুসন্ধান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ভারতে নথিপত্রহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘শনাক্ত, বহিষ্কার ও নির্বাসন’ অভিযানের অংশ হিসেবে শত শত মানুষকে বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং আরো অনেকে আটক কেন্দ্রে রয়েছেন। প্রথমে পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত মুসলিম বাংলাদেশীদের লক্ষ্য করে অভিযান শুরু হলেও বর্তমানে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে তাদের ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) চেষ্টা চলছে। এ পরিস্থিতি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিভাজনও তীব্র করছে বলে জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সীমান্তবর্তী হাকিমপুর এলাকায় এমনই এক চেকপয়েন্টে অপেক্ষা করছেন রাইসুল ইসলাম। তার স্ত্রী রেবেকা খাতুন এবং দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি একটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। সেখানে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে আরো বহু মানুষকে, যাদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর ‘শনাক্ত করো, নির্মূল করো ও নির্বাসিত করো’ নীতির আওতায় নথিপত্রহীন মুসলিম অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে সীমান্ত এলাকায় বিশেষ হোল্ডিং সেন্টার বা আটক কেন্দ্রও স্থাপন করা হয়েছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চার হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে দুই বাংলার মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি ও শ্রমবাজারভিত্তিক যোগাযোগ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসন ইস্যু রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

মুসলিমদের মধ্যে উদ্বেগ

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এ অভিযান শুধু বাংলাদেশী অভিবাসীদের নয়, পশ্চিমবঙ্গের বহু ভারতীয় মুসলমানের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তাদের আশঙ্কা, নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারাও হয়রানির শিকার হতে পারেন।

এর আগে ২০২৫ সালে আসামে নথিপত্রহীন অভিবাসী সন্দেহে কয়েকজন ভারতীয় মুসলিমকে জোরপূর্বক বাংলাদেশ সীমান্তে পাঠানোর ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ তাদের ফিরিয়ে দিলে তারা কিছু সময় নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকা পড়েছিলেন। মানবাধিকারকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, পশ্চিমবঙ্গেও একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচনী প্রচারণায় নথিপত্রহীন বাংলাদেশী অভিবাসীদের বহিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আলজাজিরার ভাষ্যানুযায়ী, এই নীতি মূলত মুসলিম বাংলাদেশীদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে, অন্য দিকে নির্দিষ্ট আইনগত সুবিধার আওতায় হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী অভিবাসীরা ছাড় পাচ্ছেন।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গত কয়েক সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। তাদের অনেককে সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আবার অনেকে আটক কেন্দ্রে রয়েছেন।

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন টানাপড়েন

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। এর মধ্যে সীমান্তে পুশইন ইস্যু দুই দেশের সম্পর্ককে আরো সংবেদনশীল করে তুলেছে।

বাংলাদেশ সরকার বারবার বলছে, কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশী দাবি করা হলে প্রতিষ্ঠিত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অন্য দিকে বিজিবি জানিয়েছে, ৪ জুনের পর থেকে বিএসএফের অন্তত ১৮টি পুশইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এ নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে বৈঠকও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে দুই হাজার ৮০০-এর বেশি সন্দেহভাজন বাংলাদেশির তথ্য ঢাকার কাছে পাঠিয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ

মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভারতের এ পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেছেন, কোনো ব্যক্তির বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও তাকে আইনি সহায়তার সুযোগ দিতে হবে, যাতে কোনো ভারতীয় নাগরিক ভুলভাবে বহিষ্কারের শিকার না হন।

তিনি এ ধরনের নির্বাসন প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সাথে অসঙ্গত বলে মন্তব্য করেন।

বাড়ছে ধর্মীয় উত্তেজনা

আলজাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রধানত মুসলিম বাংলাদেশীদের লক্ষ্য করে পরিচালিত এ অভিযান পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে তুলছে। রাজ্যটির প্রায় ২৭ শতাংশ জনগোষ্ঠী মুসলিম। দীর্ঘ দিন ধরেই বিজেপি বাংলাদেশী অভিবাসন ইস্যুকে রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।

অধিকারকর্মী তিস্তা সেতলবাদ অভিযোগ করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই ছাড়াই মানুষকে আটক করা হচ্ছে এবং তাদের জোরপূর্বক সীমান্তে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। তিনি আটক কেন্দ্রগুলোতে থাকা ব্যক্তিদের তথ্য প্রকাশ এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

আলজাজিরার মতে, সীমান্তে চলমান এই অভিযান শুধু অভিবাসন প্রশ্নেই নয়, বরং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।