লেবাননে ইসরাইলি হামলায় নিহত ৫ ২৪টি গ্রাম খালির নির্দেশ

লেবাননকে অস্ত্রের ওপর রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া আধিপত্য অথবা মিলিশিয়া প্রভাব দু’টির মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে : প্রেসিডেন্ট

Printed Edition

আলজাজিরা ও মিডলইস্ট মনিটর

আমেরিকার মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দক্ষিণ লেবাননে বিমান ও কামানের জোরালো হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলি বাহিনী। সর্বশেষ হামলায় এক পৌর মেয়রসহ অন্তত পাঁচজন লেবানিজ নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় অন্তত ২৪টি শহর ও গ্রামের বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অবিলম্বে জাহরানি নদীর উত্তরে চলে যাওয়ার জন্য জোরপূর্বক উচ্ছেদ বা গণ-স্থানান্তরের চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেলআবিব।

লেবাননের জাতীয় বার্তা সংস্থা (এনএনএ) জানিয়েছে, টায়ার জেলার মাআরকেহ শহরে ইসরাইলের পৃথক বিমান হামলায় একজন নিহত হন। অন্য দিকে জিজাইন জেলার আর-রিহান পৌরসভায় সরাসরি হামলা চালিয়ে মেয়র আলী বাদিকে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। এ ছাড়া নাবাতিহ জেলার দেইর আল-জাহরানি এবং কাফর রেমান শহরে আরো তিনজন নিহত হয়েছেন। ভোররাতে বিনতে জাবিল এলাকায় ইসরাইলি বোমাবর্ষণে একাধিক সরকারি ভবন ও বেসামরিক ঘরবাড়ি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।

হামলার তীব্রতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ইসরাইলি সামরিক বাহিনী নতুন করে লেবাননের ২৪টি গ্রাম খালি করার নির্দেশ দিয়েছে। এই জোরপূর্বক উচ্ছেদ আদেশের আওতায় রয়েছে দেইর আল-জাহরানি, আল-নামিরিয়াহ, আল-শারকিয়াহ, কাফর জুজ, জিবদিন, হরুফ, হাব্বুশ, জারজুহ, আরব সালিম, কাফরশুবা, সাযেদ, রেইহান এবং আল-লুইজাহসহ বেশ কিছু এলাকা। পরবর্তীতে এই তালিকায় ঘাসানিয়াহ, আজ-জরারিয়াহ, মাজরাত কাউতারিয়াত এর-রিজ এবং সির আল-গারবিয়াহ নামক আরো ৪টি গ্রাম যুক্ত করা হয়। ইসরাইলি বাহিনী স্পষ্ট জানিয়েছে, এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের নিজেদের সুরক্ষায় অবিলম্বে জাহরানি নদীর উত্তরে সরে যেতে হবে।

বৈরুত থেকে গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ইসরাইলিরা যেটিকে ‘ইয়েলো লাইন’ বা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা বলছে, তারও অনেক উত্তরে অবস্থিত শহরগুলোতে গতকাল শুক্রবার থেকে শুরু করে আজ শনিবার পর্যন্ত মুহুর্মুহু বিমান হামলা চালানো হয়েছে। টায়ার জেলার কানা, বাজৌরিয়াহ ও রাশকানানিয়াহ গ্রামে নতুন করে বিমান হামলার পাশাপাশি বিনতে জাবিলের খিরবেত সেলম গ্রামে ব্যাপক গোলন্দাজ বাহিনীর শেলিং করা হয়েছে। জবাবে গতকাল শনিবার লেবানন থেকে একটি ‘শত্রুভাবাপন্ন ড্রোন’ অনুপ্রবেশ করায় উত্তর ইসরাইলের মেতুলা শহরে বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয়।

লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে গত ১৭ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। ওয়াশিংটনে বৈরুত ও তেলআবিবের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনাও হয়েছে। এমনকি গত শুক্রবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষই যুদ্ধ অবসানের একটি খসড়া চুক্তিতে একমত হয়েছে। কিন্তু এই শান্তি আলোচনার মাঝেই ইসরাইলের এই আগ্রাসন লেবাননকে নতুন সঙ্কটে ফেলেছে।

দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসনের এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে গতকাল শনিবার লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফাউন দেশবাসীকে এক ভাগ্য নির্ধারণী বা সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন বলে সতর্ক করেছেন। লেবাননের সাবেক মন্ত্রী টনি সুলেমান ফ্রাঞ্জিয়ার ৪৮তম শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, লেবানন আজ এক ঐতিহাসিক সঙ্কটের মুখে। দেশের মানুষকে এখন বেছে নিতে হবে- তারা কি অস্ত্রের ওপর রাষ্ট্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হবে, নাকি থ‘মিলিশিয়া’ বাহিনীর অযৌক্তিক প্রভাব ও বর্জনের সংস্কৃতির কাছে জিম্মি হয়ে থাকবে?

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জাতীয় ঐক্যকে একটি ‘অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিজ্ঞা করেন, তিনি এমন একটি লেবানন গঠনে কাজ করবেন যেখানে ভৌগোলিক সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ প্রকৃত নাগরিকত্ব, আইন ও ন্যায়ের শাসনে স্বাধীন ও সমান অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে।