ক্রীড়া প্রতিবেদক নিউ ইয়র্ক থেকে
খেলা শেষ। দর্শকরা একে একে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সির ম্যাট লাইফ স্টেডিয়াম। তবে নিজে আর গ্যালারির সিট ছেড়ে উঠতে পারছিলেন না একজন। কারণ একা উঠার শক্তি তেমন নেই। তেমনি একা হাঁটতেও পারবেন না। তাই তার হুইল চেয়ারের অপেক্ষায় ছিল পরিবারের অন্য সদস্যরা। বলা হচ্ছে নিকোলাস গলানোসের কথা। তিনি ব্রাজিলের নাগরিক। যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন পুরো পরিবারের ছয় সদস্যকে নিয়ে। দক্ষিণ ব্রাজিলের পোর্তো আলেগ্রেতে থাকেন তিনি। এই ব্যক্তি শরীরের এই বাজে অবস্থার মধ্যেও চলে এসেছেন নিউ ইয়র্কে। কারণ বিশ্বকাপ ফুটবল দেখা তার নেশা। সেই ১৯৭০ সাল থেকে মাঠে বসে বিশ্বকাপ খেলা দেখছেন তিনি। কোনোটিই মিস দেননি। যেহেতু মহান আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তাই কেন আসবেন না স্টেডিয়ামে। তাই দক্ষিণ আমেরিকা থেকে চলে এসেছেন উত্তর আমেরিকায়।
গেলানসের বয়স ৮৯। এই বয়সে তার একার পক্ষে দূর দেশে বিশ্বকাপ দেখা সম্ভব নয়। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন পুরো পরিবার নিয়ে। ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী, নাতি, ছেলের বউ- সবাই তার যুক্তরাষ্ট্র সফরের সঙ্গী। গ্রিসের নাগরিক এই নিকোলাস গেলানস। ১৯৪১ সালে ইউরোপের এই দেশটি ছেড়ে ব্রাজিলে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। তা ইউরোপজুড়ে হওয়া দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কারণে। এরপর থিতু হয়েছেন পোর্তো আলেগ্রেতে। সেখানে তার পুরো পরিবারের কনস্ট্রাকসন ব্যবসা।
ব্রাজিলের প্রতিটি মানুষের রক্তেই ফুটবল। তা অতীত থেকে বাস করা ব্রাজিলিয়ান বা পরে অভিবাসী হওয়া সবাই। গেলানসও তাই। তবে তিনি জানান, তার সময়ে প্লাস্টিকের বল ছিল। সেটা দিয়েই ফুটবল খেলতেন। অত বড় কোনো খেলোয়াড় ছিলেন না। নিজ এলাকাতেই ফুটবল গণ্ডি।
১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ থেকেই ল্যাতিন আমেরিকান দেশটির অংশগ্রহণ। আর গেলানস মাঠে বসে বিশ্বকাপ দেখা শুরু করেন ১৯৭০ সাল থেকে মেক্সিকো বিশ্বকাপ দিয়ে। এরপর আর থামেননি। টানা ১৫টি বিশ্বকাপ তিনি দেখেছেন। তাই তার গায়ে ১৫ লেখা ব্রাজিলের জার্সি। এই যুক্তরাষ্ট্রেই তিনি ১৯৯৪ সালে ব্রাজিলের শিরোপার উৎসবের স্বাক্ষী হয়েছিলেন। যেমনটি ১৯৭০ সালে মেক্সিকোর মাঠেও করেছিলেন। তাই ৮৯ বছর বয়সী গেলানসের সবচেয়ে স্মরণীয় এই দুই বিশ্বকাপই। কারণ ব্রাজিল যে ওই দুই বছর বিশ্বকাপ জিতেছে। পেলে- বেবেতোদের উত্তরসূরিরা ২০০২ সালে জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। নিকোলাসও ওই বিশ্বকাপ দেখতে জাপান গিয়েছিলেন। তবে নিকোলাস গোলানোসের কাছে এশিয়ায় হওয়া প্রথম বিশ্বকাপটি ততটা স্মরণীয় নয়। হালকা ইংরেজি জানেন। বয়সের ভারে ঠিকমতো কথাও বলতে পারেন না। তা ছাড়া তার ব্রাজিলিয়ান পর্তুগিজ ভাষা বুঝারও উপায় নেই আমার। তাই নাতি নিকোলাসকে দিয়ে দ্বোভাষীর কাজ করালেন। বেশ ভালো ইংরেজি জানেন কিশোর নিকোলাস।
সিনিয়র গেলানস ১৫ বিশ্বকাপ দেখেছেন। আর তার স্ত্রী মানোলে গেলানস দেখেছেন ১০ বিশ্বকাপ। ছেলে গ্যাবিরিডিকির দেখার সুযোগ হয়েছে পাঁচ বিশ্বকাপ। এ ছাড়া মেয়ে ভিভজিনিয়া গেলানস, ছেলের বউ ক্লাভিন্ডিয়া লিয়াল এবং নাতি নিকোলাস এ গেলানস চারটি করে বিশ্বকাপের মাঠের দর্শক। ৯০ ছুঁই ছুঁই গেলানস জানান, ‘১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ দিয়েই পুরো পরিবারের এক সাথে এই আসর দেখার সূত্রপাত।’ ব্রাজিল আবারো যুক্তরাষ্ট্রের মাটি থেকে বিশ্বকাপ জিতে দেশে ফিরবে। এটা অন্য সব দেশী-বিদেশী ব্রাজিলের সমর্থকরা প্রত্যাশা করছেন। তবে তেমনটা ভাবছেন না নিকোলাস গেলানস। তার মতে, এবার ব্রাজিল দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা ফিফটি-ফিফটি। মরক্কোর বিপক্ষে জিততে না পেরে যেন নিজেদের দুর্বল অবস্থানের বার্তাই দিলো পাঁচবারের বিশ্বসেরারা।
ফুটবলের যেকোনো লেভেলের পরিচিত এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির কাছেই প্রশ্ন থাকে কে সেরা, পেলে না ম্যারাডোনা। তবে গেলানস সরাসরি বললেন ‘পেলে’ই সেরা।
বাংলাদেশে প্রচুর মানুষ বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে সমর্থন করে। এই সংখ্যা কোটির ওপরে। এই তথ্য দেয়ার পর গেলানস জানান, ব্রাজিলের মানুষও কিন্তু পছন্দ করে বাংলাদেশীদের।



