নয়া দিগন্ত ডেস্ক
দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, অবরোধ ও ধ্বংসযজ্ঞের ফলে গাজা উপত্যকা আজ এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত, হাসপাতাল, স্কুল ও আবাসনব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত, আর মৌলিক সেবাগুলো প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহল থেকে গাজার পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও, সাম্প্রতিক একটি প্রস্তাব নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
আলজাজিরার মতামত কলামে বলা হয়েছে, জাতিসঙ্ঘের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত নিকোলাই ম্লাদেনভের প্রস্তাবিত ১৫ দফার রূপরেখাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গাজার পুনর্গঠন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রকৃতপক্ষে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নয়; বরং রাজনৈতিক শর্ত আরোপের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ওপর নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দেয়ার একটি কৌশল। প্রস্তাবটির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, গাজার অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের বিষয়টি রাখা হয়েছে সর্বশেষ ধাপে। অর্থাৎ ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা জরুরি সেবার পুনর্গঠন শুরু হওয়ার আগে ফিলিস্তিনিদের একাধিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গঠন এবং একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা। সমালোচকদের মতে, এটি মানবিক সহায়তাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে দেওয়া সুবিধা হিসেবে উপস্থাপন করছে। গাজার বর্তমান সংকটকে কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রবণতাও এই পরিকল্পনার একটি বড় সীমাবদ্ধতা। কারণ ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ বা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উত্থানকে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব, অবরোধ, অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা। এসব কারণ উপেক্ষা করে শুধুমাত্র অস্ত্র সমর্পণকে সমাধানের পূর্বশর্ত হিসেবে দাঁড় করানো হলে মূল সমস্যাগুলো অমীমাংসিতই থেকে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবে একটি রাজনৈতিক আলটিমেটামের মতো কাজ করে; অর্থাৎ নির্ধারিত শর্ত মেনে নিতে হবে, অন্যথায় বর্তমান সঙ্কট আরো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরিবর্তে শক্তির ভারসাম্যহীনতাকে স্থায়ী করার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে পুনর্গঠন আর মানবিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয় না; বরং তা রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের নীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি নতুন নজির তৈরি হতে পারে। যদি যুদ্ধবিধ্বস্ত জনগণের পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন রাজনৈতিক শর্তের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে মানবিক সহায়তাও রাজনৈতিক স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হবে এবং মানবিক নীতির মৌলিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ইতিহাস বলছে, জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া কোনো রাজনৈতিক কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না; বরং এটি ক্ষোভ ও অসন্তোষকে আরো গভীর করে। গাজার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। বহু বছর ধরে সেখানে ধ্বংস, সীমিত পুনর্গঠন এবং পুনরায় সংঘাতের যে চক্র চলছে, তা ভাঙতে হলে কেবল অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সুযোগ, স্বাধীন চলাচল এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
গাজার অবশ্যই পুনর্গঠন প্রয়োজন। কিন্তু সেই পুনর্গঠন যদি শর্ত, নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে, তবে তা স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করবে না; বরং মানবিক সঙ্কটকে দীর্ঘস্থায়ী করে ভবিষ্যতের আরো বড় অস্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে তুলবে। তাই গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে যে কোনো উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার, কেবল নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থ নয়।
অর্থসঙ্কটে দুর্বল জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রম
এ দিকে অর্থায়নের ঘাটতির কারণে গাজা উপত্যকায় গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ত্রাণসহায়তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি জানায়, তহবিল ঘাটতির কারণে মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলো সেখানে তাদের জরুরি সেবা কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। নিউ ইয়র্কে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জানান, গাজা ও পশ্চিমতীরের জন্য চলতি বছরের ৪.১ বিলিয়ন ডলারের মানবিক সহায়তা তহবিলের ১৫ শতাংশেরও কম অর্থ এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, অর্থসঙ্কটের কারণে সহায়তা সংস্থাগুলোর পরিকল্পনা, ত্রাণ মজুদ এবং জরুরি সাড়া দেয়ার সক্ষমতা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। বর্তমানে গাজার অধিকাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষে চারটি মানবিক সংস্থা ধীরে ধীরে পানি সরবরাহ কার্যক্রম কমিয়ে দিতে শুরু করেছে। এর ফলে প্রায় তিন লাখ ৩০ হাজার মানুষ তাদের প্রধান পানীয় জলের উৎস হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। খাদ্যসহায়তার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ খাবার বিতরণ করা হলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ছয় লাখ ৭৮ হাজারে নেমে এসেছে। দুজারিক সতর্ক করে বলেন, নতুন অর্থায়ন না এলে আরও অনেক সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তিনি দাতা দেশগুলোর প্রতি জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান এবং মানবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে এমন বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
তেল ও গ্যাস সঙ্কট তীব্র
গাজায় চলমান মানবিক সঙ্কটের মধ্যে খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতির পাশাপাশি এবার তীব্র আকার ধারণ করেছে ইঞ্জিন তেল, যন্ত্রাংশ ও রান্নার গ্যাসের সংকট। এর প্রভাব পড়ছে হাসপাতাল, বেকারি, পানীয় জল সরবরাহ, পরিবহন ও জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমে। ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকাটিতে একের পর এক নতুন সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের। মধ্য গাজার আল-আকসা শহীদ হাসপাতাল সম্প্রতি সতর্ক করে জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী জেনারেটর বিকল হয়ে পড়ায় সেখানে স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হাসপাতালের পরিচালক রায়েদ হুসেইন বলেন, অস্ত্রোপচার কক্ষ সচল রাখতে ব্যবহৃত একটি ছোট জেনারেটর হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের কয়েকটি অপারেশন কক্ষ সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছে। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ না থাকায় প্রকৃত মেরামতের বদলে অস্থায়ী সমাধানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
একই সময়ে গাজার সিভিল ডিফেন্স বিভাগ জানিয়েছে, যন্ত্রাংশ ও ইঞ্জিন তেলের সঙ্কটে তাদের অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি দমকল যান ও দু’টি অ্যাম্বুলেন্স বিকল হয়ে গেছে। বর্তমানে তারা শুধু সবচেয়ে জরুরি ঘটনাগুলোতে সাড়া দিতে পারছে। যুদ্ধের আগে যেখানে এক লিটার ইঞ্জিন তেলের দাম ছিল প্রায় ২৫ শেকেল, এখন তা বেড়ে ২ হাজার ২০০ শেকেলে পৌঁছেছে। যন্ত্রাংশের দামও কয়েকগুণ বেড়েছে। গাড়ি মেরামতকারী রফিক হামুদা জানান, তেল না থাকায় মেরামত করা অনেক যানবাহনও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি পুরনো গাড়ি খুলে তার যন্ত্রাংশ অন্য গাড়িতে ব্যবহার করছেন। পরিবহন সঙ্কট সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। জাতিসঙ্ঘের শিশু তহবিল জানিয়েছে, যন্ত্রাংশ ও ইঞ্জিন তেলের অভাবে গাজার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও মারাত্মক চাপের মুখে। সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় নিরাপদ পানির সঙ্কট আরো বেড়েছে।
গাজা ও পশ্চিমতীরে সঙ্ঘাতের মধ্যেই ‘নাকসা’ দিবস পালন
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের ৫৯তম বার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার ‘নাকসা’ দিবস পালন করেছেন ফিলিস্তিনিরা। এমন এক সময়ে দিবসটি পালিত হলো যখন গাজা ও অধিকৃত পশ্চিমতীরে চলমান সামরিক অভিযান ও সহিংসতা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ১৯৬৭ সালের ৫ জুন শুরু হওয়া ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইল পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুসালেম, গাজা উপত্যকা, সিনাই উপদ্বীপ এবং গোলান মালভূমির নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরবর্তীতে সিনাই মিশরের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হলেও পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুসালেম ও গোলান মালভূমি নিয়ে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের মতে, এবারের নাকসা দিবস এমন এক বাস্তবতায় পালিত হচ্ছে যখন গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রভাব এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও সামরিক তৎপরতা বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে পশ্চিম তীরে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত, হাজারো মানুষ আহত ও আটক হয়েছেন। ওয়াসেল আবু ইউসুফ বলেন, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ ছিল ১৯৪৮ সালের নাকবার পর ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতির আরেকটি বড় অধ্যায়। তার মতে, এরপর থেকে ভূমি অধিগ্রহণ, বসতি সম্প্রসারণ এবং নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়ার নীতি অব্যাহত রয়েছে।
ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি ও সামরিক ঘাঁটির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৪৫-এ। একই সঙ্গে বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজারে পৌঁছেছে। ফিলিস্তিনি নেতারা বলছেন, নাকবা ও নাকসার স্মরণ শুধু অতীতের ইতিহাস নয়; এটি ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।



