অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সূচকের বড় ধরনের উন্নতির পর পুঁজিবাজারে ফের সংশোধন ঘটেছে। গতকাল সোমবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের কিছুটা উন্নতি ধরে রাখলেও দিনশেষে লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানির বেশির ভাগ দরপতনের শিকার হয়। তবে বাজারগুলোর লেনদেনের চিত্র ছিল ভিন্ন। দুই বাজারেই বৃদ্ধি পেয়েছে লেনদেন যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, রোববার সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটায় বাজারের স্বাভাবিক আচরণের অংশ হিসাবে এ সংশোধন ঘটে। কিন্তু একই সাথে লেনদেনের উন্নতি প্রমাণ করে সংশোধন সত্ত্বেও বাজারের সাথেই ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। কারণ তাদের কাছেও এটা প্রত্যাশিত ছিল।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৫ দশমিক ৪০ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। পাঁচ হাজার ৬২৫ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৬৪০ দশমিক ৭৫ পয়েন্টে। তবে লেনদেন শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৫০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। সূচকের এ অবস্থানে এসে প্রথমবার বিক্রয়চাপ তৈরি হলে নি¤œমুখী হয়ে ওঠে সূচকটি। তবে বেলা ১১টার দিকে ফের ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে সূচক। দুপুর ১২টায় সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৬০ পয়েন্ট। এখান থেকেই দ্বিতীয়বার বিক্রয়চাপ তৈরি হলে আবার নি¤œমুখী হয় সূচক। লেনদেনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ বিক্রয়চাপ সক্রিয় থাকলে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের বড় অংশই হারিয়ে বসে বাজার। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ যথাক্রমে ৮ দশমিক ৩৩ ও ৫ দশমিক ২৮ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) গতকাল সবগুলো সূচকের উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। বাজারটির সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই এদিন ৫২ দশমিক ৩১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ১৫ হাজার ৩৪৩ দশমিক ৩৩ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি বিকেলে লেনদেন শেষে ১৫ হাজার ৩৯৫ দশমিক ৬৪ পয়েন্টে স্থির হয়। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৫৬ দশমিক ৮৫ ও ১২ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট।
সংশোধন সত্ত্বেও গতকাল দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনের উন্নতি ঘটে। ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল এক হাজার ৪৫৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৯৮ কোটি টাকা বেশি। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা। সে হিসাবে ডিএসইর গতকালের লেনদেন ছিল সাম্প্রতিক সময়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে গত ৭ জুন এক হাজার ৫২৯ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে বাজারটি, যা ছিল ২০২৪ সালের আগস্টের পর ডিএসইর সর্বোচ্চ লেনদেন। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারও আগের দিনের তুলনায় এগিয়ে ছিল লেনদেনে। বাজারটি গতকাল ৪২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে। আগের দিন সিএসইর লেনদেন ছিল ২৪ কোটি টাকা।
এদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকিং খাতের কোম্পানি ইসলামী ব্যাংক পিএলসির প্রতি আবার বিনিয়োগকারীরা নিজেদের আস্থা প্রকাশ করতে শুরু করেছে। গতকাল টানা তৃতীয় দিনের মতো সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ দরে লেনদেন হয়েছে কোম্পানিটির শেয়ার। গত ৮ জুন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তালিকাভুক্ত দুই কোম্পানি বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে। এরপর দু’দিন ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের বড় দরপতন ঘটলেও তৃতীয় দিনের মাথায় ঘুরে দাঁড়ায় কোম্পানিটি। এরপর গতকালসহ টানা তিনটি কর্মদিবস সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ দরে লেনদেন হচ্ছে কোম্পানিটি। অথচ ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর বেক্সিমকো লিমিটেড গতকালসহ প্রতিদিনই সর্বোচ্চ দরপতনের শিকার হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য কোনো ক্রেতা আসছে না কোম্পানিটির শেয়ার কিনতে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত কিছুদিন থেকে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বাজারে বিভিন্ন কথা চাউর হতে দেখা যায় যা কোম্পানিটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল তৈরি করে। বিশেষ করে বিতর্কিত একজন ব্যক্তিকে ব্যাংকটিতে নিয়োগ দেয়ার পর থেকে আমানতকারীরা এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। এর ফলে ব্যাংকটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে পৌঁছে। এ কারণেই দু’দিন কোম্পানিটি শেয়ারের ক্রেতা পায়নি। কিন্তু পরবর্তীতে দ্রুতই তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় ব্যাংকটি। রোববার রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এই ব্যাংকটির পুরো পর্ষদ ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে নিয়ে নিলে গোটা পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তারা মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে থাকলে ধীরে ধীরে ব্যাংকটি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে পাবে। গতকালও কোম্পানিটির শেয়ারের প্রচুর ক্রেতা থাকলেও বিক্রেতার ঘর ছিল শূন্য।
গতকাল ডিএসইর বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, এদিন সবচেয়ে বেশি সংশোধন ঘটেছে বীমা খাতে। সাম্প্রতিক সময়ে বীমা খাতের প্রায় সবগুলো কোম্পানিরই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। গতকাল এ খাতে প্রায় ৮০ শতাংশ কোম্পানিই দর হারায়। দিনের শুরুতে সূচকের বড় উন্নতির পর এ খাতে সংশোধনই মূলত সূচকের উন্নতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে একই সময় ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূল্যবৃদ্ধির বড় পতন থামিয়ে দেয়।
ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি। ৮১ কোটি টাকায় কোম্পানিটির দুই কোটি ৯২ লাখ ৭১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ৫৪ কোটি ২৪ লাখ তিন কোটি ১৯ লাখ ৫১ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে ব্যাংকিং খাতের এনসিসিবি ছিল দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বেক্সিমকো ফার্মা, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, সিটি ব্যাংক, জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেড, লাভেলো আইসক্রিম, পিপলস ইন্স্যুরেন্স, ব্র্যাক ব্যাংক ও বিডি খাই ফুডস।



