ক্রীড়া প্রতিবেদক
ফর্টিস ১-০ মুরাস
(ইব্রাহিম)
‘ওরে বাবা মুরাস। ওরাতো খুবই শক্তিশালী দল।’ গত বছর এই আগস্ট মাসে যারা জাতীয় স্টেডিয়ামে ঢাকা আবাহনীর সাথে এই মুরাস এফসির খেলা দেখেছিলেন তারা এভাবেই ভয় ধরাচ্ছিলেন কিরগিজস্তানের ক্লাবটিকে নিয়ে। সেই ম্যাচে আবাহনীকে এই আসরেই ২-০তে হারিয়েছিল। অন্য দিকে ফর্টিস এফসি তাদের কাবু করতে বেলা ৩টায় ম্যাচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। লিগে তৃতীয় হওয়া দলটি সেই গরমকে পুঁজি করেই গড়ে ফেলল ইতিহাস। বাংলাদেশের প্রথম ক্লাব হিসেবে দেশের মাঠে হারাল মধ্য এশিয়ান কোনো ক্লাবকে। গতকাল কিংস এরিনায় এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের প্রিমিলিমিনারি রাউন্ডের ম্যাচে মুরাসকে হারিয়ে আরেকটি ইতিহাস গড়ল ফর্টিস। প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেই মোহাম্মদ ইব্রাহিমের গোলে জয়। মুরাসকে হারিয়ে তারা এখন এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের গ্রুপ পর্বে উন্নীত হলো। অন্য দিকে গত বছর সেমিতে খেলা মুরাসকে এবার বিদায় নিতে হলো এক ম্যাচ খেলেই।
মূল শক্তি ছিল আট বিদেশী। তাই এদের সবাইকেই একাদশে রেখে মাঠে নামে ফর্টিস এফসি। প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ। তাও সেটা লিগ চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস ও রানার্সআপ ঢাকা আবাহনীর এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগে খেলার লাইসেন্স না থাকায়। অপ্রত্যাশিত ভাবে পাওয়া এই সুযোগ কাজে লাগাতেই এএফসির নিয়মের পূর্ণ সুবিধাই নিয়েছে। এএফসির নিয়ম হলো এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের আসরে বিদেশী খেলানোর সংখ্যা উন্মুক্ত; অর্থাৎ একটি দল যত খুশি তত বিদেশী খেলাতে পারবে। বাংলাদেশ ফুটবল লিগের জন্য নির্ধারিত সাফ কোটা আর অন্য দেশের বিদেশীসহ দুই হালি বিদেশীকে একাদশে রাখেন কোচ মাসুদ পারভেজ কায়সার।
কিংস এরিনায় উপস্থিত ২১১৩ জন দর্শক আর আট বিদেশী। সাথে স্থানীয় মোহাম্মদ ইব্রাহিম, ইনসান ও রাসেল। এদের নিয়েই শুরু থেকে মুরাস এফসির বিপক্ষে চড়াও হয়ে খেলতে থাকে ফর্টিস এফসি। গোলের সুযোগ আসছিল। কিন্তু ফরোয়ার্ডদের নিখুঁত ফাইনাল পাসে ভুল এবং গোল মিস লিড নিতে দেয়নি। কাউন্টার অ্যাটাকে পাসগুলো যে ধরনের যথাযথ হওয়া প্রয়োজন সেটা করতে পারছিল না ফর্টিসের খেলোয়াড়রা। এরপর যে পাসগুলো ভালো হচ্ছিল সে চান্সগুলো নষ্ট করেছেন অধিনায়ক পা ওমর বাবাউরা।
একেতো প্রচণ্ড গরম তার উপর মুরাসকে চেপে ধরতে প্রথম থেকেই আক্রমণাত্মক মুডে ফর্টিস। ম্যাচের ৩৬ সেকেন্ডেই গোলে শট নেয় ফর্টিস। দলপতি গাম্বিয়ার পা ওমর বাবাউর শট চলে যায় পোস্টের বাইরে। ৪ মিনিট বয়সে পা ওমরের স্বার্থপরতায় গোল পায়নি এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের স্বাগতিকরা। তিনি পাশে ফাকায় থাকা সতীর্থকে বল না দিয়ে নিজে চেষ্টা করেই নষ্ট করেন সুযোগ। ১২ মিনিটে ইব্রাহিমের পাস থেকে স্টিফেন চুকুদে বল নিয়ন্ত্রনেই নিতে পারেননি। বলটি ধরতে পারলে গোল হতে পারত ২২ মিনিটে গোলের খুব কাছ থেকে ফিরে আসতে হয় ফর্টিস এফসিকে। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে বল পেয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন পা ওমর। কাউকে পাস না দিয়ে নিজেই শট নেন পোস্টে। তবে গোল পোস্ট হতাশ করে তাকে। তার শট মুরাসের গোলরকক্ষক ওরেস কোস্টেইয়াকের পায়ে লেগে পোস্টে বাধা পেয়ে বাইরে যায়। অবশ্য বাহরাইনের রেফারি হোসেন আহমেদ আল সোহাইক কর্নারও দেননি। একটু পরেই পা ওমরের শট যায় বার উঁচিয়ে।
ম্যাচে ৬ মিনিটে প্রথম গোলের সুযোগ পায় মুরাস। তবে এরমেকভ বাইবেলের হেড লক্ষভ্রস্ট হলে এগিয়ে যেতে পারেনি কিরগিজ ক্লাবটি। ৩৮ ও ৪১ মিনিটে মুরাসের শুকুরভ ও থমাসের শট বারের উপর দিয়ে যায়। গরমের কারনে খেলতে পারছিল না মুরাসের ফুটবলাররা। তিন ফুটবলার মাঠ ছাড়েন ইনজুরিতে পড়ে। এতে করে তারা খেই হারিয়ে ফেলে।
বিরতির পরপরই গোলের জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাতে থাকে মুরাস। ৪৭ মিনিটে ইসলাম তাহিরভিচের শট কর্নার করেন ফর্টিসের শ্রীলঙ্কান গোলরক্ষক সুজান পেরেরা। ৫১ মিনিটে আতাবায়েভ এরবলের শটও কর্নার করেন সুজান। এর পরপরই গোল এগিয়ে ফর্টিসের। এই গোলের পুরো কৃতিত্ব পা ওমরের। নিজ দক্ষতা ও স্কিলে মুরাসের খেলোয়াড়কে পরাস্ত করে বল নিয়ে ঢুকে পড়েন বিপক্ষ সীমানায়। এরপর ফাঁকায় থাকা ইব্রাহিমের উদ্দেশে বল বাড়ান। ঢাকা আবাহনী থেকে লোনে নেয়া জাতীয় দলের সাবেক এই ফুটবল বল ধরে আর ভুল করেননি। দুই কদম এগিয়ে বাম পায়ের শটে পরাস্ত করেন কিরগিজ ক্লাবটির গোলরক্ষককে। ৫৫ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুযোগ হারায় ফর্টিস। এতে অবশ্য পুরো কৃতিত্ব মুরাসের গোলরক্ষকের। প্রথমে পা ওমরের কর্নার কিক জালে যাওয়ার সময় তা ক্লিয়ার করেন তিনি। এরপর ফিরতি বলে নেপালী এরিখ বিস্তার বাম পায়ের বাকানো শট ডান দিকে পুরো শরীর ভাসিয়ে কর্নার করেন ওরেক কস্টিয়াক। ৫৯ মিনিটে মুরাসের নূর সুলতানের শট ক্রসবার ঘেঁষে বাইরে যায়। ৬৪ মিনিটে জিয়ানিসের শট কর্নার করেন সুজান পেরেরা।
৭৪ মিনিটে ম্যাচে ফেরার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করে মুরাস। মাদানভের শট বক্সে হাতে লাগে এরিখ বিস্তার। রেফারি পেনাল্টি দিলেও আতাবায়েব এরবলের শট পোস্টে লেগে প্রতিহত হয়। ফলে রক্ষা বাংলাদেশী ক্লাবটির।
ফর্টিস কোচ কায়সার শেষ ৮/৯ মিনিট রক্ষণভাগে শক্তি বাড়িয়ে এক গোলের লিডকে ধরে রাখে। এরপর খেলা শেষের বাঁশি বাজার সাথে সাথেই ক্লাবের খেলোয়াড়দের বাঁধভাঙা উল্লাস।
এর আগে এএফসি কাপে মুক্তিযোদ্ধা তুর্কমেনিস্তানের মাঠে ১-০ গোলে হারিয়েছিল নেবিথচিকে। তবে ঢাকার মাঠে ড্র এর বেশি কিছু করা সম্ভব হয়নি বাংলাদেশী অন্য ক্লাবগুলোর।



