নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির শেষযাত্রা উপলক্ষে গতকাল সোমবার রাজধানী তেহরানে লাখো মানুষ সমবেত হয়েছেন। দেশটির কর্তৃপক্ষের ধারণা, এ জনসমাগম কয়েক দশক আগে তার পূর্বসূরির শেষযাত্রায় অংশ নেয়া মানুষের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা জানানো হয়নি। তবে এএফপির প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, তেহরানের প্রধান প্রধান সড়কজুড়ে মানুষের বিশাল ঢল নেমেছে। এএফপির ছবিতে দেখা যায়, রাজপথ দিয়ে যাওয়ার সময় কফিনটি ফুলের পাপড়িতে ঢেকে দেয়া হয়।
তেহরান থেকে এএফপি জানায়, পাঁচ সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে যুদ্ধের পর এ আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের দৃঢ়তা তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে ইরান। তবে নজর এখনো খামেনির উত্তরসূরি তার ছেলে মোজতবা খামেনির দিকে, যিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে জনসমক্ষে উপস্থিত হননি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রথম দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হওয়া আলি খামেনির লাশ রাজধানীর গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে দুই দিন রাখা হয়। এরপর সোমবার বিপুল জনসমাগমের মধ্য দিয়ে কফিনটি রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণের জন্য নেয়া হয়। এএফপির ছবিতে দেখা গেছে, ফুলের পাপড়িতে আচ্ছাদিত কফিনটি ধীরে ধীরে তেহরানের সড়ক অতিক্রম করছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকেও এই মিছিলে অংশ নিতে দেখা গেছে। চরম গরমের মধ্যে শোকাকুল জনতার শরীর শীতল করতে ট্রাক থেকে পানি ছিটানো হয়। পাশাপাশি আয়োজকরা ইরানের পতাকা এবং আলি ও মোজতবা খামেনির ছবি বিতরণ করেন। প্রায় ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) দীর্ঘ পথজুড়ে এই মিছিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আলি খামেনির নামাজে জানাজায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার সেøাগান উঠেছে। রোববার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে খামেনির কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে এই আহ্বান জানানো হয়। গ্র্যান্ড মোসাল্লায় অনুষ্ঠিত এই জানাজা শোকের পাশাপাশি প্রতিশোধের আবেগে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হাজারো মানুষ আগের রাত থেকেই মসজিদ চত্বরে অবস্থান নেন। তাদের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা, খামেনির ছবি এবং লাল পতাকা।
নামাজে জানাজা শুরুর আগে কবি মোহাম্মদ রাসুলি একটি কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে বলেন, এখন থেকে কাফনের কাপড়ই আমাদের পোশাক। আপনার রক্তের কসম, ট্রাম্পকে হত্যা করা এখন আমাদের দায়িত্ব। তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি আমাদের ইমামকে হত্যা করেছে, আমরা কেন তাকে হত্যা করব না? এটা না করা আমাদের জন্য কলঙ্ক। তার বক্তব্যের পর উপস্থিত জনতা তুমুল করতালি দিয়ে সমর্থন জানায়। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাকের জোলকাদর বলেন, জনগণ দু’টি সেøাগান দিচ্ছেন শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ।
প্রায় ৩০ হাজার ধারণক্ষমতার চত্বর ভোর হওয়ার আগেই কানায় কানায় ভরে যায়। অনেকে সাদা কাফন পরে এসেছিলেন। চারদিকে সেøাগান উঠছিল, কোনো আপস নয়, কোনো আত্মসমর্পণ নয়, শুধু প্রতিশোধ। কিছু জায়গায় ‘কিল ট্রাম্প’ লেখা বার্তাও দেখা যায়। তেহরানের বাসিন্দা লায়লা আহমাদি বলেন, প্রয়োজনে লাঠি-কোদাল নিয়েও আমরা লড়ব। আরেক বাসিন্দা হোসেন দেহঘান বলেন, নেতাকে সন্ত্রাসী কায়দায় হত্যা করার পর মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ। এটা কোনো স্বাধীন দেশের সাথে করা যায় না।
কর্তৃপক্ষ ১৯৮৯ সালে খামেনির পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শেষযাত্রার সময় ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খলার পুনরাবৃত্তি এড়াতে সতর্ক রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার তথ্য অনুযায়ী, সে সময় প্রায় এক কোটি মানুষ শেষযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন। খোমেনির শেষযাত্রায় পদদলিত হয়ে ১০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছিলেন। শেষযাত্রায় অংশ নেয়া ৫৮ বছর বয়সী গোলামরেজা খানবাবাই বলেন, ‘আমি যদি সেই অনুষ্ঠানের সাথে এটির তুলনা করি, তাহলে বলব- দু’টির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তবে এবার মানুষের আবেগ আরো বেশি বলে মনে হচ্ছে।’
সাবেক নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সোমবার তেহরানের আকাশসীমা বন্ধ রাখা হয়। শোকাহত মানুষ ইরানের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি তেহরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর পতাকা এবং প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে লাল পতাকা বহন করেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের ইমাম হোসেন চত্বরে সমবেত কিছু মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কুশপুত্তলিকা ঝুলিয়ে রাখেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদও শেষযাত্রায় অংশ নেন। তীব্র গরমের মধ্যে শোকাহত মানুষের স্বস্তির জন্য ট্রাক থেকে পানি ছিটানো হয়। একই সাথে আয়োজকদের পক্ষ থেকে ইরানের জাতীয় পতাকা এবং আলি ও মোজতবা খামেনির ছবি বিতরণ করা হয়। শেষযাত্রার পথ প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর এক দিন আগে হাজারো মানুষ গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে গিয়ে খামেনি এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত তার পরিবারের চার সদস্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
পদদলনের ঘটনা এড়াতে কমপ্লেক্সের ভেতরে বিশাল কংক্রিটের দেয়াল দিয়ে সাধারণ মানুষকে কফিন থেকে আলাদা রাখা হয়। সোমবারের শোভাযাত্রায় সাধারণ মানুষ কতটা কাছে যেতে পারবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ১৯৮৯ সালের অভিজ্ঞতা থেকে কর্তৃপক্ষ সতর্ক রয়েছে। সে সময় শোকাহত জনতা খোমেনিকে বহনকারী যানবাহনে উঠে পড়ায় তার কাফনের কাপড় ছিঁড়ে যায় এবং লাশ মাটিতে পড়ে যায়। পরে তাকে হেলিকপ্টারে করে দাফনের স্থানে নিতে হয়েছিল।
সোমবারের শোভাযাত্রার পর আজ মঙ্গলবার ধর্মীয় নগরী কোমে এবং বুধবার ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় একই ধরনের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের নিজ শহর মাশহাদে খামেনিকে দাফন করা হবে।
রোববার আলি খামেনির তিন ছেলে বিরলভাবে জনসমক্ষে উপস্থিত হন। এতে মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি আরো বেশি আলোচনায় আসে। বাবার নিহত হওয়ার পরপরই তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হলেও তিনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমান হামলায় তিনি আহত হয়েছেন। তবে তার আঘাত কতটা গুরুতর, তা স্পষ্ট নয়।
ইরানের প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নতুন কমান্ডার আহমাদ বাহিদিও রোববার দ্বিতীয়বারের মতো শেষকৃত্যে অংশ নেন। তার পূর্বসূরি ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হন। পুরো যুদ্ধ চলাকালে তিনি জনসমক্ষে দেখা না দিলেও এবার খোলা স্থানে উপস্থিত হন। বিপ্লবী গার্ডের বিদেশী অভিযানবিষয়ক কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি-ও বিরলভাবে জনসমক্ষে দেখা দেন। গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর সরকারের প্রতি জনসমর্থন প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবে ব্যাপক জনসমাগমকে তুলে ধরতে আগ্রহী কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধবিরতি ও প্রাথমিক সমঝোতার পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আপাতত স্থগিত রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন ও তেহরান- উভয়ই আবার সামরিক অভিযান শুরু করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। শেষযাত্রাজুড়েও প্রতিশোধের আহ্বান ছিল অন্যতম প্রধান বিষয়। পশ্চিমা বিশ্বের সাথে দীর্ঘদিন ধরে আপসহীন নীতি অনুসরণ করেছিলেন আলি খামেনি। একই সাথে তেহরান বহু বছর ধরে ফিলিস্তিনের হামাস এবং লেবাননের হিজবুল্লাহসহ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। এ দুই সংগঠনও শেষকৃত্যে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। শেষযাত্রায় অংশ নেয়া অনেক সমর্থকও একই ধরনের অবস্থান ব্যক্ত করেন। গোলামরেজা খানবাবাই বলেন, ‘আমরা প্রতিশোধ চাই। এটি নিতেই হবে। কারণ পরে যদি তা না নেয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।’



