জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গড়িমসিতে গভীর সঙ্কটে পড়বে দেশ

জুলাই বিপ্লব পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের মূল রূপরেখা ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী শিবিরের অনড় অবস্থান দেশটিকে এক গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনবিদরা। এক দিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির আইনি ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার যুক্তি, অন্য দিকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর রাজপথের আন্দোলনের হুমকি- এই দুই মেরুর অবস্থানে জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে।

আলমগীর কবির
Printed Edition

জুলাই বিপ্লব পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের মূল রূপরেখা ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী শিবিরের অনড় অবস্থান দেশটিকে এক গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনবিদরা। এক দিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির আইনি ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার যুক্তি, অন্য দিকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর রাজপথের আন্দোলনের হুমকি- এই দুই মেরুর অবস্থানে জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে।

আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ছিল বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত জনবিস্ফোরণ। ফলে এই পরিবর্তনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকাণ্ডকে কেবল প্রচলিত সংবিধানের সীমাবদ্ধ ফ্রেমওয়ার্কে বিচার করলে জুলাই সনদের মূল চেতনা অধরাই থেকে যাবে। বিশেষ করে, উচ্চ আদালতে গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা নিয়ে রিট এবং সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে বিএনপির আপত্তির ফলে যে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা রাষ্ট্র সংস্কারের গতিকে মন্থর করে দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়, বরং এটি ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয়া এক নতুন সামাজিক চুক্তির প্রতিফলন। এই সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব এবং দীর্ঘসূত্রতা জনমনে সংশয় ও অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলছে। আইনবিদরা মনে করছেন, সময় মতো এই সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে না পারলে দেশ এক ভয়াবহ শাসনতান্ত্রিক শূন্যতায় পড়তে পারে, যা প্রকারান্তরে বিপ্লবের অর্জনকেই ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে চিন্তা করলে জুলাই সনদকে বোঝা সম্ভব নয়। কারণ, জুলাই বিপ্লবের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়েছিল, সংবিধানে তার কোনো উল্লেখ ছিল না। মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থেকেই উপদেষ্টা পরিষদের ধারণাটি এসেছে, যা বিচারপতি খাইরুল হক বাতিল করে দিয়েছিলেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে- অন্তর্বর্তী সরকার তবে কিসের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিল? এর উত্তর হলো এই সরকার বাংলাদেশের লিখিত সংবিধানের ঊর্ধ্বে জনগণের ‘সার্বভৌম কর্তৃত্বের’ ভিত্তিতে গঠিত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের এই সার্বভৌম ম্যান্ডেটের ফলে সরকার কিছু অনন্য ক্ষমতা লাভ করেছে। যার মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র, গণপ্রজাতন্ত্র এবং নাগরিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র সংস্কারের দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ সেই বিশেষ ক্ষমতা বলেই গৃহীত হয়েছিল।’

বিপ্লবের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী উল্লেখ করেন, ‘মনে রাখতে হবে, বিপ্লব কখনো সংবিধান মেনে হয় না; বরং সংবিধানের গণ্ডি ভেঙে বা বাইরে গিয়েই বিপ্লব ঘটে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ঠিক তা-ই হয়েছে। অনেকে একে কেবল কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফল হিসেবে দেখতে চান, কিন্তু আমি তা মনে করি না। কোটা আন্দোলন ছিল বিপ্লবের একটি তাৎক্ষণিক কারণ মাত্র। মূলত দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরের অন্যায়, অবিচার ও পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকেই এই মহাবিপ্লব ত্বরান্বিত হয়েছে।’

গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা নিয়ে করা রিটের সমালোচনা করে ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ‘এটি কার্যত পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের আচরণেরই প্রতিফলন। লক্ষ্য করলে দেখবেন, আওয়ামী লীগ সরকার যে জাতীয় ইস্যুগুলো এড়িয়ে যেতে চাইত, সেগুলো সমাধানের পথ বন্ধ করতে পরিকল্পিতভাবে আদালতের দ্বারস্থ হতো। সরাসরি পদে নেই নিজেদের মতাদর্শের অনুসারী আইনজীবীদের দিয়ে রিট করিয়ে তারা সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করত। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও একই কায়দায় বাতিল করা হয়েছিল। সর্বশেষ কোটা আন্দোলনের সময়ও আদালতের দোহাই দিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ানো হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট খসরুজ্জামান বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শ ও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আইনি ভিত্তি পর্যালোচনার পর বিএনপি শেষ পর্যন্ত গণভোটের রায় ও জনগণের আকাক্সক্ষাকে অবশ্যই সম্মান জানাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া এই দলটি সবসময়ই জনমানুষের ভালোবাসা ও ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। ফলে জনগণের রায়কে কীভাবে মর্যাদা দিতে হয়, তা এই দলটির চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে জুলাই সনদ বা গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে দলটির ভেতরে কিছু কৌশলগত বিতর্ক বা দ্বিমত দেখা দিতে পারে, যা একটি বড় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের জন্য অস্বাভাবিক নয়। তবে দিনের শেষে দেশ ও জনগণের বৃহত্তর কল্যাণের প্রশ্নে বিএনপি তার অনড় ও ইতিবাচক অবস্থানেই ফিরে আসবে। কারণ, বিএনপির রাজনীতির মূল চালিকাশক্তিই হলো জনস্বার্থ। সাময়িক কোনো আইনি জটিলতা বা মতপার্থক্য থাকলেও, জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও জনগণের চূড়ান্ত অভিপ্রায়কে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্র সংস্কারের এই মহাযজ্ঞে বিএনপি শেষ পর্যন্ত সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে বলেই দেশের সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করে।’

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মুনির বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে বলেন, ‘জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিএনপি এখন যেভাবে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে, তা ঐতিহাসিকভাবে সাংঘর্ষিক। কারণ, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই দেশে প্রথম প্রচলিত সংবিধানের ঊর্ধ্বে গিয়ে গণভোটের প্রবর্তন করেছিলেন। এমনকি জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী যে বিশেষ আদেশে বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়েছেন, সেটিও বিদ্যমান সংবিধানের আক্ষরিক কাঠামোতে ছিল না। তাই আমাদের বারবার মনে রাখতে হবে, এই গণভোট রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ এটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নাগরিকদের সরাসরি অভিপ্রায় ব্যক্ত করার সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক সুযোগ।’

তিনি আরো ব্যাখ্যা করেন, ‘আমাদের মতো পরোক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কেবল প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত থাকে, যা নীতিনির্ধারণে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণকে সঙ্কুচিত করে। রাষ্ট্র শাসনের মৌলিক নীতিনির্ধারণে গণভোট একটি অপরিহার্য পদ্ধতি। ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গত ৫০ বছরে বিশ্বে প্রায় ২ হাজার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ৬০০টিরও বেশি ছিল সংবিধান সংশোধন বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে। ফলে এটি প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিপূরক হিসেবেই কাজ করে।’

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘গণভোটের সুস্পষ্ট ফলাফলের পর জনগণের সম্মিলিত অভিপ্রায় নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। যারা গণতান্ত্রিক রীতিনীতি সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার করেন, সেই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জনসমর্থিত সংস্কারকে উপেক্ষা করে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারেন না। এটি করা হবে গণতান্ত্রিক আদর্শের চরম লঙ্ঘন। জনগণ যেমন বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে দেখতে চায়, তেমনি একটি শক্তিশালী সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের বাস্তবায়নও তাদের প্রত্যাশা।’

পরিশেষে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘গণভোটের আগে বিএনপি এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন জানিয়েছিল এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিল। এখন যদি দলটি গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি করে, তবে জাতি এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কটের মুখে পড়বে।’