জেলা ফুটবল লিগের বেহাল দশা

গত বছর মাত্র তিন জেলায় লিগ হয়েছে

Printed Edition

রফিকুল হায়দার ফরহাদ

‘আমি নির্বাচিত হলে বা আমরা বাফুফের ক্ষমতায় গেলে জেলার ফুটবল উন্নয়নে ভূমিকা রাখব। জেলার ফুটবল না এগুলে দেশের ফুটবলের উন্নতি হবে না।’ বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচন এলেই বাফুফের প্রার্থীদের মুখে ফেনা উঠে এই জেলা ফুটবল নিয়ে। আসলে এ সবই হলো নির্বাচনী ধান্ধা। জেলা ও বিভাগের ৭০টি ভোট নিজের পক্ষে পাওয়ার জন্য। ভোটে জেতার পর ঠিক মতো খেয়াল রাখা হয় না এই জেলা লিগের। অন্য দিকে জেলার কাউন্সিলররা যারা ভোটের সময় মুহূর্তেই সুর পাল্টান, একজনের পক্ষে থেকে ভোট দেন আরেক জনকে, তারাও নিজেরা কোনো উদ্যোগ নেন না জেলা লিগ আয়োজনে। যে কারণে ফুটবলের এই পুনঃজাগরণের সময়ও গত বছর মাত্র তিনটি জেলায় লিগ হয়েছে। এই তিন জেলার মধ্যে শুধু মাগুরায় হয়েছে প্রথম বিভাগ লিগ। কিশোরগঞ্জ ও সিলেটে হয়েছে দ্বিতীয় বিভাগ লিগ। আর ২০২৪ সালে পাঁচ-ছয় জেলা লিগ করতে পেরেছিল। পরশু বাফুফে কর্মকর্তাদের এই জেলা লিগ নিয়মিত করার তাগিদ দেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। বাফুফের জেলা লিগ কমিটির চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন গতকাল জানান, আমরা এ বছরই ৪০-৪৫টি জেলায় লিগ শুরুর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছি।

জেলায় লিগ করতে পারে না। তবে বাফুফের নির্বাচনের সময় এই জেলার কাউন্সিলররা এক জোট হয়। এদের কাছে ফুটবল উন্নয়নে যোগ্য প্রার্থীর কোনো মূল্যায়নই নেই। কখনো প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়, কখনো যার কাছ থেকে বেশি সুবিধা পাওয়া যায় সেদিকেই হেলে পড়ে। এদের কারণেই আনোয়ারুল হক হেলালের মতো যোগ্য লোক বাফুফের নির্বাচনে ফেল করেছিলেন। বাফুফের বর্তমান সভাপতি তাবিথ আওয়াল বাফুফের ২০২০ সালের নির্বাচনে সহসভাপতি পদে দুই দফা ভোটে অংশ নিয়েও পাস করতে পারেননি। তখন জেলার সাথে ঢাকার ক্লাবের অর্ধেক ভোটার তাবিথের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ২০১২ সালের নির্বাচনে জেলার এই ভোটারদের দ্বৈরাত্ম কমানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তখন যিনি এই উদ্যোগ নেন তাকেই ভোটে সাইজ করা হয়। অর্থাৎ হারিয়ে দেয়া হয়। তখন অবশ্য বাফুফেরই দুই এক কর্মকর্তা ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে গুটিবাজীটি করেছিল। আবার এই জেলার কাউন্সিলর করার ক্ষেত্রেও নীতি বিবর্জিত কাজ করা হয় বলে অভিযোগ আছে। যে কারণে অযোগ্য ব্যক্তিরা জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পদে থাকে বলেই লিগ নিয়মিত হয় না।

এরপরও কিছু জেলার প্রকৃত ফুটবলপ্রেমীরা ডিএফএতে থাকেন। তাই লিগও হয়। মাগুরা জেলা গত বছর আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১৭ দল নিয়ে তিন মাসব্যাপী লিগ করেছিল। এতে তাদের পাঁচ লাখ টাকার মতো ব্যয় হয়েছিল। আর সিলেট ও কিশোরগঞ্জে দ্বিতীয় বিভাগ লিগে অংশ নেয়া দলের সংখ্যা ছিল ১০-১২টি মতো। এরা অবশ্য নিজস্ব তহবিল থেকেই লিগ সম্পন্ন করে। নিয়মিত লিগ করার কৃতিত্ব আছে ময়মনসিংহ জেলার। তারা গত বছর লিগ আয়োজেন ব্যর্থ হলেও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় বিভাগ লিগ মাঠে নামিয়েছিল।

বলা হয়ে থাকে জেলা ক্রীড়া সংস্থা থেকে (ডিএসএ) জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডিএফএ) আলাদা হওয়ার কারণেই মাঠ সঙ্কটে জেলা লিগ হচ্ছে না। অথচ ১৯৯৯ সালে যখন প্রথম জাতীয় ফুটবল লিগ চালু হয় তখন বাফুফে বিভিন্ন জেলার ফুটবল লিগের তথ্য হাতে নেয়। তখন দেখা গেছে পিরোজপুরসহ তিনটি জেলায় কখনই লিগ হয়নি। কিছু জেলায় আগের ৮-১০ বছরে কোনো লিগ মাঠে গড়ায়নি। তখন কিন্তু ডিএফএ ছিল না। ছিল জেলা ক্রীড়া সংস্থায় কিছু অযোগ্য ব্যক্তি।

নিটল টাটা জাতীয় ফুটবল লিগ চালু হওয়ার পর জেলায় জেলায় লিগ আয়োজনের হিড়িক লেগেছিল। অবশ্য পরে পেশাদার লিগ চালু করতে গিয়ে বাফুফে বন্ধ করে দেয় সেই জাতীয় লিগ। এরপর জেলা লিগ নিয়মিত করার চেষ্টা করেও সফলতা আসেনি। তবে ২০১২-১৩ সিজনে প্রাইম ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় ৪৮-৪৯টি জেলায় লিগ হয়েছিল। ২০১৪ সালে নিটল টাটা শেখ কামাল জেলা লিগে ৪৬টি জেলার অংশগ্রহণ ছিল। সবচেয়ে বেশি ৬২টি জেলায় ফুটবল লিগ হয়েছিল ২০১৮ সালে। সেবার বাফুফে ও সাইফ পাওয়ারটেকের পাল্টাপাল্টি উদ্যোগে জেলা লিগ আয়োজনে এই ধুম পড়ে যায়।

সেই ধারা ক্রমে ২০১৯ সালে বাফুফে ৬৪টি জেলাকে পাঁচ লাখ করে টাকা দেয় লিগ আয়োজনের জন্য। তবে ওই টাকায় ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৪০-৪৫টি জেলায় লিগ হয়েছিল। বাকি ডিএফএ গুলো টাকা নিয়েও লিগ করেনি। উল্লেখ্য, ২০২০ সালে শুরু হওয়া করোনা মহামারীর জন্য জেলা লিগ বন্ধ ছিল। তাই ওই টাকায় কোনো কোনো জেলা ২০২৩ সালে লিগ করে।

এবার জেলা লিগ আয়োজনে সক্রিয় বাফুফে। জেলা লিগ কমিটির চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন জানান, গত বছরতো বিভিন্ন ডিএফএতে দায়িত্ব নেয়ার মতো লিগ ছিল না। কেউ পালিয়ে ছিল। তাই লিগ হয়নি। এখন আমরা নতুন করে ডিএফএ গঠন করে জেলায় জেলায় লিগ করার উদ্যোগ নিয়েছি। একটি স্পন্সর জোগাড় করে এ বছর ৪০-৪৫টি জেলায় লিগ করতে চাই। সব জেলায় পারব না। কারণ কিছু জেলায় স্টেডিয়ামে সমস্যা আছে।