অপরিকল্পিত শিল্পকারখানা স্থাপনে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত

গাজীপুরে জলাবদ্ধতায় ৪ গ্রামের ২ হাজার পরিবারের দুর্ভোগ

Printed Edition
গাজীপুরের মির্জাপুরে জলাবদ্ধ লোকালয় : নয়া দিগন্ত
গাজীপুরের মির্জাপুরে জলাবদ্ধ লোকালয় : নয়া দিগন্ত

মো: আব্দুল আজিজ জয়দেবপুর (গাজীপুর)

গাজীপুর সদর উপজেলার মির্জাপুর ও ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের চারটি গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষিজমিতে অপরিকল্পিতভাবে শিল্পকারখানা নির্মাণ এবং পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না রাখায় বৃষ্টির পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই পশ্চিম ডগরী, কাঞ্জানুল, বানিয়ারচালা ও শিরিরচালা গ্রামের প্রায় দুই হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া জলাবদ্ধতায় শত শত একর কৃষিজমির ফসল নষ্ট হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

সরেজমিন দেখা যায়, মির্জাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ডগরী ও নয়াপাড়া এলাকার মধ্যবর্তী প্রায় ১০০ একর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে আছে। পাশের প্রায় ২০০টি পরিবারের বাড়িঘর ডুবে গেছে। ফলে ওই সব পরিবারের সদস্যরা এখন চরম দুর্ভোগে জীবনযাপন করছেন।

স্থানীয় কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, কৃষিকাজই তার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। জলাবদ্ধতায় ধানের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। তার মতো শতাধিক কৃষক এখন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে। তিনি দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তার আবেদন জানান।

স্থানীয় ইউপি সদস্য এমদাদুল হক বলেন, প্রায় চার বছর আগে ডায়নামিক পলিমার কারখানা কৃষিজমির মধ্যে নির্মাণের সময় এলাকাবাসী পানি চলাচলের পথ রাখার দাবি জানিয়েছিল। কারখানা কর্তৃপক্ষ সে সময় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এরপর থেকেই বর্ষা এলে পশ্চিম ডগরী এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

স্থানীয় বিএনপি নেতা নূর হোসেন সরকার বলেন, এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছাড়া এ সঙ্কটের সমাধান হবে না।

তবে ডায়নামিক পলিমারের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, কারখানার সীমানার দুই পাশে জায়গা ফাঁকা রাখা হয়েছে। স্থানীয়রা চাইলে সেখানে ড্রেনেজ ব্যবস্থা করতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করবে।

মির্জাপুর ইউনিয়নের কাঞ্জানুল গ্রামের পরিস্থিতি আরো নাজুক। স্থানীয়দের দাবি, গত এক সপ্তাহের বৃষ্টিতে প্রায় এক হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক পরিবার শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছে, গবাদিপশু মারা যাচ্ছে এবং শিশুদের মধ্যে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।

সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জসিম উদ্দিন বলেন, যে নালা দিয়ে একসময় গ্রামাঞ্চলের পানি নেমে যেত, সেটি এখন বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বিডি ফুড ও ডেকো সিরামিকস কারখানা স্থাপনের কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। জলাবদ্ধতায় কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলের মানুষ দুর্ভোগে কষ্ট পাচ্ছে।

এ বিষয়ে বিডি ফুডের ব্যবস্থাপক বাহাদুর বলেন, কারখানার ভেতরে অন্যের জায়গা নেই। এলাকার পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেখার বিষয়।

অন্য দিকে ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের বানিয়ারচালা ও শিরিরচালা গ্রামেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইভিটেক্স ও মন্ডল ইন্টিমেটসসহ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের সময় পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না রাখায় বৃষ্টির পানি আটকে যাচ্ছে। এতে প্রায় এক হাজার পরিবার দুর্ভোগে পড়েছে। জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিরিরচালা জামিয়া ইসলামিয়া মদিনাতুল উলুম কওমি মাদ্রাসা। বৃষ্টির সময় শ্রেণিকক্ষ ও আবাসিক ভবনে পানি ঢুকে যাচ্ছে। এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

ইভিটেক্সের মহাব্যবস্থাপক মনিরুজ্জামান বলেন, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ড্রেনেজ না থাকলেও পানি অপসারণের জন্য পাম্প ব্যবহার করা হয় এবং অন্যের জমিতে পানি ফেলা হয় না। মন্ডল ইন্টিমেটসের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক বলেন, নিজস্ব ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হলেও বিভিন্ন জটিলতায় তা এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: সাজ্জাত হোসেন বলেন, বিষয়টি তার কাছে আগে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। অভিযোগের কথা জানার পর তিনি সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের দাবি, শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও কৃষিজমি ও জনবসতির স্বার্থ উপেক্ষা করে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। তারা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার দাবি জানান।