ঢাকার বাতাসে প্রাণঘাতী বিষাক্ত কণা বাড়ছে, বছরে প্রাণহানি ১০ হাজার

আবুল কালাম
Printed Edition

দূষণে নাজেহাল ঢাকা শহরের বাতাসে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে প্রাণঘাতী কণার বিষাক্ত মাত্রা। বাতাসে পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম) বা ভাসমান বস্তুকণার উপস্থিতি এখন মানুষের সহনশীলতার চেয়ে ১৫ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২৫ বছরে দেশে সামগ্রিক বায়ুদূষণের মাত্রা ৬৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। প্রধানত ছয়টি উৎস থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত কণার ভারী চাদরে ঢাকা পড়েছে মেগাসিটি ঢাকার দুই কোটি মানুষের আকাশ। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকি, যার জেরে নগরবাসীর গড় আয়ু কমছে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর। কেবল রাজধানীতেই বায়ুদূষণজনিত রোগে বছরে প্রাণ হারাচ্ছেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার এবং স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) যৌথ গবেষণা বলছে, ঢাকার বাতাসে পিএম ২.৫ (২.৫ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট অতি-ক্ষুদ্র কণা) মানবস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। শুষ্ক ও শীত মৌসুমে এই কণার ঘনত্ব ডব্লিউএইচওর নির্ধারিত বার্ষিক নিরাপদ সীমার চেয়ে ১০ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত ওপরে চলে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অতি-ক্ষুদ্র কণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সরাসরি ফুসফুস ও রক্তে মিশে গিয়ে স্থায়ী স্বাস্থ্যসঙ্কট তৈরি করছে।

কণা দূষণের প্রধান ৬ উৎস

বিশ্বব্যাংকের ‘পরিবর্তনের নিঃশ্বাস’ শীর্ষক প্রতিবেদন এবং পরিবেশ অধিদফতরের সমীক্ষায় ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান ছয়টি উৎস সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে : ইটভাটা : মোট বায়ুদূষণের প্রায় ৫৮ শতাংশের জন্য এককভাবে দায়ী ঢাকার চারপাশের শত শত ঐতিহ্যগত ইটভাটা; যানবাহনের ধোঁয়া: ফিটনেসবিহীন ও পুরনো মোটরযান থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া ১০.৪ শতাংশ দূষণ ছড়ায়; সড়কের ধুলাবালু : অপরিকল্পিত রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও সড়ক ওড়ানোর ধুলা ৭.৭ শতাংশ দূষণের উৎস; শিল্প-কারখানা: ফিল্টারবিহীন জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো ও সিসাযুক্ত নির্গমন ৭.৬৩ শতাংশের জন্য দায়ী; মাটির ধুলো ও নির্মাণকাজ: মেগা প্রকল্প ও ভবন নির্মাণ স্থলের ওড়া ধুলো প্রায় ৭.৬ শতাংশ দূষণ বাড়ায় আর জৈবপদার্থ ও বর্জ্য পোড়ানো : খোলা স্থানে আবর্জনা ও প্লাস্টিক পোড়ানোর ধোঁয়া ৭.৪ শতাংশ দূষণ তৈরি করে।

দুই যুগে দূষণ বৃদ্ধি ৬৬ শতাংশ

এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স (একিউএলআই) এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২৫ বছরে বাংলাদেশে কণা দূষণের মাত্রা ৬৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দূষিত দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এই দীর্ঘমেয়াদি দূষণের কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনকাল গড়ে ২.৪ বছর করে হ্রাস পেয়েছে। স্টেট অব গ্লোবাল এয়ারের তথ্যমতে, দেশব্যাপী প্রতি বছর বায়ুদূষণজনিত স্ট্রোক, হৃদরোগ, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ ও ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রায় এক লাখ ৭২ হাজার মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও বিশ্লেষণ

পরিবেশবিজ্ঞানী ও মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রব নয়া দিগন্তকে বলেন, “বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বাধিক ভুক্তভোগীদের অন্যতম বাংলাদেশ। অপরিকল্পিত নগরায়ণে সবুজে ঘেরা ঢাকা এখন বিবর্ণ। ইতোমধ্যে নির্ধারিত প্রয়োজনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সবুজায়ন ধ্বংস করা হয়েছে। এসব কারণে বাতাস দূষিত হয়ে দুই কোটির অধিক মানুষের এই নগরী এখন অনেকটা ‘মৃত নগরীতে’ পরিণত হয়েছে।”

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান এবং ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, “বছরের নভেম্বর থেকে মার্চ-এই পাঁচ মাস ঢাকায় চরম বায়ুদূষণ ঘটে। এর পেছনে স্থানীয় চার কারণের (ইটভাটা, নির্মাণকাজ, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও বর্জ্য পোড়ানো) পাশাপাশি শীতকালে উত্তর দিক থেকে আসা আন্তঃদেশীয় দূষণ বা ‘ট্রান্স-বাউন্ডারি এয়ার পলিউশন’ বড় ভূমিকা রাখে। এই শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টি না থাকায় ধূলিকণা বাতাসে দীর্ঘ সময় ভাসমান থাকে।”

প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস

বিদ্যমান ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো: জিয়াউল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘দূষণের উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণ করা বেশ জটিল। আমাদের মোট দূষণের প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে দেশের বাইরে থেকে, যা নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের হাতে নেই। তবে স্থানীয় দূষণ রোধে পরিবেশ আইনে শাস্তির বিধান আরো কঠোর করা হচ্ছে। যারা নিয়মনীতি না মেনে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি বা নির্মাণকাজ করবে, তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।’

অবৈধ ইটভাটার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন যে, নতুন কোনো ইটভাটাকে আর পরিবেশগত ছাড়পত্র দেয়া হবে না এবং বিদ্যমান অবৈধ ভাটাগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধের অভিযান চলছে। এ ছাড়া ইকোনমিক লাইফ শেষ হওয়া ও ফিটনেসবিহীন পুরনো বাস-ট্রাক রাস্তা থেকে সরিয়ে নেয়া এবং খোলা স্থানে কঠিন বর্জ্য পোড়ানো বন্ধে সিটি করপোরেশনের সাথে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

নগর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঢাকা ও এর চারপাশের বাসযোগ্যতা এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে হলে কেবল আইনের ঘোষণা নয়, বরং রাজউক, সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদফতরের জিরো টলারেন্স নীতি ও দৃশ্যমান বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি।